Tax

বাজেট ২০১৯-২০: অবহেলিত চাকরীজীবী করদাতা

July 28, 2019
Budget Image

এ বছরও ২০১৯-২০ এর বাজেট ব্যক্তি করদাতাদের জন্য কোন সুখবর নিয়ে আসেনি। গত কয়েক বছর ধরে করমুক্ত আয়ের সীমা ২৫০,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০,০০০ টাকায় উন্নীত করার জন্য ব্যক্তি করদাতারা দাবি জানিয়ে আসছিলো। কিন্তু গত বাজেটে বিদায়ী অর্থ মন্ত্রী এমএ মুহিত যা বলেছিলেন ঠিক একই কথা এবারও শুনিয়েছেন নতুন দায়িত্ব পাওয়া অর্থ মন্ত্রী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এ এইচ এম মুস্তফা কামাল।

ব্যবসায়ীদের দিক থেকেও কয়েক বছর ধরেই কর্পোরেট ট্যাক্স রেট কমিয়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সমান করার জন্য দাবি তুলে আসছিলেন। ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ ছিলো অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে কর হার তুলনামূলক বেশি। কিন্তু তাদের কথাও রাখলেন না ব্যবসায়ী অর্থ মন্ত্রী।

গত বাজেটে ব্যাংকিং সেক্টরে কর হার ২.৫% কমানো হয়েছিলো। অনেক লম্বা সময় ধরেই ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থায় আছে। সেই চিন্তা করেই বিদায়ী অর্থ মন্ত্রী কর হার কমিয়েছিলেন। এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণে। তাই এ বছর আর কর হার কমানোর দিকে যাননি।

কর সুবিধা কমানো বা আগের অবস্থায় রাখার মূল কারন হলো রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা। কারন প্রতি বছরই বাংলাদেশের বাজেট লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এখন বড় বাজেট দিলে তার বাস্তবায়ন করতে টাকার দরকার। এই টাকা আসবে করদাতাদের পকেট থেকে। তাই ব্যাক্তি করদাতা এবং কর্পোরেট করদাতাদের উপরই যে চাপ বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।

ব্যক্তি করদাতার বাজেট কেমন হলো?

ব্যক্তি করদাতার আশা পূরণ হয়নি এ বাজেট থেকে।

তবে এই আশা যে পূরণ হবে না তা গত বছরের বাজেট থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিলো। বিদায়ী অর্থ মন্ত্রী গত বাজেটে যা বলেছিলেন নতুন অর্থ মন্ত্রী এবারের বাজেটে তার পুনরাবৃতি করেছেন। তিনি বলেছেন, উন্নত দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা জন প্রতি আয়ের ২৫% নিচে। আবার কিছু কিছু দেশে আয়ের সমান। আর সেখানে আমাদের দেশে তা দেড় গুণ। তবে মিডিয়াতে প্রকাশিত কিছু লেখা থেকে জানা যায়, দূরে নয় আমাদের পার্শবর্তি দেশগুলোতেই আমাদের তুলনায় করমুক্ত আয়ের সীমা বেশি। আবার কোথাও কর হারও কম।

আমাদের সর্ব নিন্ম কার হার শুরু হয়েছে ১০% থেকে। এই হারও বেশি এবং এটাও কমিয়ে ৫% বা ৭.৫% এ নিয়ে আসার দাবি উঠেছিলো। কিন্তু সেই দাবিও রাখা হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা ঠিক জায়গাতে রেখে যদি কর হার কমিয়ে ৭.৫%-এ রাখা হতো তাহলে করদাতারা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতেন।

অর্থ মন্ত্রী করমুক্ত আয় বৃদ্ধি না করার আরেকটি বড় কারন ঢেকে না রেখে বাজেট বক্তব্যেই বলে দিয়েছেন, করমুক্ত আয় বৃদ্ধি করলে অনেক নতুন করদাতা কর আওতার বাইরে থেকে যাবে। তবে এর সাথে সাথেই অর্থ মন্ত্রী দাবি করেছেন, গত কয়েক বছর ধরে করদাতারা এই আয়ের উপর কর দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

এক দশক আগে আয়কর থেকে রাজস্ব আহরণের হার ছিলো ২০%। এটা এই সরকারের সময় বেড়ে ৩৫% হয়েছে। আগামী ২০২১-২২ অর্থ বছরের মধ্যে মোট রাজস্ব আয়ের অর্ধেক আয়কর খাত থেকে অর্জন করতে চায় সরকার।বর্তমানে টিনদারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ। এটা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এক কোটিতে নিয়ে যেতে চান।

এসব টার্গেট পূরণ করতে গেলে করদাতাদের উপরই চাপ পড়বে। নতুন করদাতা খুজে বের করার জন্য প্রতি বছরই আয়কর আইনে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আয়কর অফিস নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এবং টিনদারীর সংখ্যা যাতে বৃদ্ধি করা যায় সে জন্য আয়কর আইনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেমন, এখন থেকে এক লাখ টাকার উপরে কোন কিছু কিনে দলিল করতে গেলেই আপনাকে টিন দেখাতে হবে।

পরিবর্তন এসেছে সারচার্জে

এবারের বাজেটেও সারচার্জ-এ কিছু পরিবর্তন এসেছে। অর্থ মন্ত্রী বলেছেন, যাদের অনেক সম্পদ রয়েছে তাদের অনেকেই আয়ের পরিমান কমিয়ে দেখান। তাই যারা বেশি সম্পদের অধিকারী তাদের সারচার্জের পরিমান বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিপরীতে সারচার্জ প্রযোজ্য ছিলো ২.২৫ কোটি নীট পরিসম্পদ অধীকারী করদাতাদের। এই সীমা বাড়িয়ে ৩ কোটি করা হয়েছে। সর্বনিন্ম সারচার্জ আগের মতই রয়েছে।

তবে যেইসব করদাতার নীট পরিসম্পদ ৫০ কোটি টাকা বা উহার ঊর্ধ্বে সেইসব করদাতার সারচার্জ এর পরিমান হবে উক্ত করদাতার নীট পরিসম্পদের ০.১% অথবা আয়কর প্রযোজ্য এইরূপ আয়ের উপর প্রযোজ্য আয়করের উপর ৩০% প্রদেয় সারচার্জ, এই দুইটির মধ্যে যেটি বেশি।

ট্যাক্স বাড়লো সঞ্চয়পত্রের সুদের উপর

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কয়েকটি কারনে আকর্ষণীয়। তুলনামূলক সুদের হার বেশি। বিনিয়োগ এবং সুদ উভয়ই নিরাপদ। নিন্ম হারে কর প্রদান। আর যারা আয়কর প্রদান করেন তারা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে তার উপর একটি নির্দিষ্ট হারে কর রেয়াত ভোগ করেন।

গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকের নাজুক অবস্থার কারনে সঞ্চয়কারীদের আস্থা কমে গেছে। প্রতি নিয়তই খবর বেরিয়েছে ব্যাংক তাদের আমানতকারীর টাকা সময়মত পরিশোধ করতে পারছে না। এসব কারনে সঞ্চয়পত্র নির্ভরযোগ্য একটি বিনিয়োগ খাত।

আরেকটি বিনিয়োগ খাত হলো দেশের শেয়ার বাজার। ২০১০ সালের পর থেকে শেয়ার বাজার আর ঘুরে দাড়াতে পারছেনা। সেখানেও বিনিয়োগকারীদের আশার আলো নেই।

এতোসব নেতিবাচকের মধ্যে সঞ্চয়পত্রই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা। এটা সবচেয়ে নিরাপদ এজন্য যে, এটা ইস্যু করেন বাংলাদেশ সরকার। নির্দিষ্ট সময় পরপর সুদ পাওয়া যায় এবং সময় শেষে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়া যায়।

কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগকারীদের এই আস্তার জায়গাটি নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত। সরকার এখান থেকে বাজেটের ঘটতি মেটাতে ঋণ করছেন। উল্টো দিকে বিনিয়গকারীরা ব্যাংকে বিনিয়োগ না করে উচ্চ সুদের আশায় সরকারের ইস্যুকৃত সঞ্চয়পত্র কিনছেন।

এসব কারনে ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। যার ফলে তারা একদিকে যেমন নতুন করে ঋণ দিতে পারছেনা তেমনি মেয়াদ শেষে আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছেনা।

এসব বিবেচনায় নিয়েই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কথা বলা হচ্ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুদের হারের উপর হাত না দিয়ে করের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯ অর্থ আইনে সঞ্চয়পত্রের সুদের উপর ১০% উৎসে কর নির্ধারন করা হয়েছে যেটা আগে ছিলো ৫%।

এই কর হলো আবার চূড়ান্ত করদায়। অর্থাৎ আপনি উৎসে যা দিয়েছেন সেটাই চূড়ান্ত। বছর শেষে আপনার আয় যাই হোক না কেন, আপনাকে আর কর দিতে হবে না। বিপরীতে আপনার আর কোন আয় না থাকলেও আপনি সেই কর ফেরত পাবেন না।

যাদের আয় শুধু এই সঞ্চয়পত্রের উপর নির্ভরশীল তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ঘরের গৃহিণী এবং অবসরপ্রাপ্ত চাকরীজীবীদের ভরসার আশ্রয়স্থল হলো সঞ্চয়পত্র। একজন গৃহিণী যদি মাসে দশ হাজার টাকা সুদ পান তাহলে এখন ব্যাংক এক হাজার টাকা কেটে নয় হাজার টাকা তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করবে। আগে পাচশত টাকা কেটে নয় হাজার পাচশত টাকা প্রদান করা হতো। এখন তিনি বছরে ছয় হাজার টাকা কম পাবেন।

তারপরও উপরের বিষয়গুলো বিবেচনা করলে মনে হয়, সঞ্চয়পত্রের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ কমবেনা।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্তা ফেরানোর চেষ্টা

১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে শেয়ার বাজার ধসের পর বিনিয়োগকারীদের আস্তা চলে যাওয়ার পর এখনো আর ফিরে আসেনি। আস্তা ফেরানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও বিনিয়োগকারীদের পুজিবাজার মুখী করা যায়নি। তবে বিনিয়োগ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার ফলেই হয়তো তারা শেয়ার বাজার মুখী হতে পারছেননা। হাতে টাকা এবং তারা যে ২০১০ সালে আঘাত পেয়েছেন সেই শোক ভুলে গেলেই হয়তো আবার ফিরে আসবেন।

পুজি বাজার বিনিয়োগকারীদের এ বছর বেশ ভালো কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে হলো নগদ লভ্যাংশ আগে করমুক্ত ছিলো ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত। আর কোম্পানিগুলকে নগদ লভ্যাংশ দিতে চাপে রাখা হয়েছে যাতে করে তারা বোনাস শেয়ার ইস্যু না করে নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে। সে জন্য বোনাস শেয়ার ইস্যুর উপর ১৫% কর আরোপ করা হয়েছে।

আরেকটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেটা হলো, কোম্পানি তার পুঞ্জিভূত মুনাফা এবং রিজার্ভ ফান্ড এর উপর ১৫% কর আরোপ। তবে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার পর একটু পরিবর্তন করে তা ৭০% এর উপরে গেলে ১৫% কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।

এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পুজি বাজারমুখী করার জন্য। কিন্তু বছরের শুরুতেই যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে এর কোন প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। তবে কেউ কেউ হয়তো বলবেন, এতো তাড়াতাড়ি আশা করা ভালো না। তবে দেখা যাক, সামনে সুদিন আসে কিনা। ততদিন অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

কম্পিউটার/ল্যাপটপ বিনিয়োগের উপর রেয়াত বন্ধ হলো

আয়কর রিটার্ন তৈরি বিষয়ক কর্মশালায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নগুলো আমাকে করদাতারা করতেন তার মধ্যে কম্পিউটার/ল্যাপটপ নিয়ে ছিলো একটি।

আমি গত বছর একটি ল্যাপটপ/কম্পিউটার দেখিয়েছি, এ বছরও কি তা দেখিয়ে কর রেয়াত নিতে পারবো? বা এই সুবিধা কি প্রতি বছরই নেয়া যাবে? এটা দেখালে কর অফিস পরে কোন ঝামেলা করবেনাতো?

এ রকম অসংখ্য প্রশ্ন আমাকে ব্যক্তি করদাতারা করতেন।

মূলত দেশকে ডিজিটালাইজড করার উদ্দেশ্যেই বর্তমান সরকার এই সুবিধা দিয়েছিলেন। আয়কর আইনে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা ছিলো না বলে এই নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতো। আইনে কোন অস্পষ্টতা থাকলে পরে তা এসআরও দ্বারা স্পষ্ট করা হয়। কিন্তু এই বিষয়টিকে স্পষ্ট করা হয়নি।

তবে শেষ পর্যন্ত এটা একদম বাদ দিয়ে দেওয়া হলো। এটা সবাইকেই এবার অবাক করেছে। হতাশ হয়েছেন যারা এবার আশায় ছিলেন কম্পিউটার/ল্যাপটপ দেখিয়ে কর রেয়াত নিবেন তারা। তারা এবার এই সুবিধা নিতে পারবেন না।

কর রেয়াত গণনায় পরিবর্তন এসেছে

আপনার বিনিয়োগকৃত টাকার উপর কর রেয়াত গণনার হার ছিলো তিনটি। প্রথম ২৫০,০০০ টাকার উপর ১৫%, পরবর্তী ৫০০,০০০ টাকার উপর ১২% এবং অবশিষ্ট বিনিয়োগের উপর ১০% হারে কর রেয়াত গণনা করা হতো। এভাবে গণনা করে মোট যে টাকা আসতো সে টাকাটাই কর রেয়াত হিসেবে বাদ দিয়ে বাকি টাকা সরকারকে দিতে হতো।

কিন্তু এবার বাজেটে তিনটি হারকে কমিয়ে দুইটি হার করা হয়েছে। ১৫% এবং ১০%। কোন করদাতার করযোগ্য আয় যদি ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হয় তাহলে তিনি বিনিয়োগকৃত টাকার উপর কর রেয়াত পাবেন ১৫%। আর যদি তার করযোগ্য আয় ১৫ লাখ টাকা অতিক্রম করে তাহলে তিনি কর রেয়াত পাবেন ১০%।

এর ফলে যাদের আয় কম তারা বেশি সুবিধা পাবেন। বিপরীতে যাদের আয় বেশি তারা বেশি আয়কর দিবেন। এটা করার উদ্দেশ্যই হলো কর আহরণের পরিমান বৃদ্ধি করা। এবং এর ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লাভজনক অবস্থায়ই থাকবে।

তবে ব্যক্তি করদাতাদের উপর চাপাচাপি না করে বড় করদাতাদের উপর নজর দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের দিকে মনোযোগী হওয়া উচিত।

কর্পোরেট ট্যাক্স কেমন হলো?

কর্পোরেট ট্যাক্স রেট কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের দিক থেকেও দাবী ছিলো। কিন্তু সেই দাবী রাখা হয়নি। যে কোন দাবীই এখন খুব সতর্কতার সাথে যে রাখা হবে তা গত বাজেট থেকেই অনুমান করা গেছে।

বছর বছর বাজেটের আকার বৃদ্ধিই হলো আসল কারন। অবশ্য অর্থ মন্ত্রী একটি কারন উল্লেখ করেছেন আর তা হলো, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ৫% কর্পোরেট ট্যাক্স কম। আর ব্যাংকিং খাতে ২.৫% ট্যাক্স কমানোর ফলে কর আহরন যে কম হয়েছে তাও উপরে বলেছি।

বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় খাত হলো টেলিকম খাত। এই খাত থেকে বিশাল এক অংক রাজস্ব হিসেবে আহরন করা হয়। সেই লোভ সরকার এবারও সামলাতে পারেনি। এই খাতে ন্যূনতম কর হার ছিলো ০.৭৫%। এবার বাজেটে তা বাড়িয়ে ২% করা হয়েছে।

তবে সরকার যে কর আদায়ে শুধু কঠোর তা না। কিছু কিছু খাতে সরকার অনেক ট্যাক্স সুবিধা দিয়ে থাকে। সেসব খাতে বিনিয়োগ করলে একটা লম্বা সময় ধরে কম হারে কর দেয়া যায়। এসব খাতে সরকার কম রেটে কর আদায়ের উদ্দেশ্য হলো দেশের কিছু কিছু খাত সুবিধা দিয়ে ভালো একটি অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।

আরেকটি উদ্দেশ্য হলো, দেশের সুষম উন্নয়ন। আমাদের উন্নয়ন ঢাকা কেন্দ্রিক। এবং ঢাকার আশেপাশেই উন্নয়নটা বেশি হচ্ছে। কলকারখানা, অফিস সব ঢাকার আশে পাশেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাচামাল নিয়ে এসে ঢাকা বা তার আশেপাশে ফ্যাক্টরি স্থাপন করে সেখানে উৎপাদন করছে। কিন্তু সেখানেই যদি ফ্যাক্টরি করা যেতো তাহলে একদিকে যেমন কোম্পানির উৎপাদন খরচ কমতো তেমনি সেই অঞ্চলের উন্নয়নও হতো। মানুষের ঢাকামুখী চাপ কমতো।

সর্বোচ্চ দশ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে যাতে করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। এর বাইরে কয়েক বছর আগে হাই-টেক পার্ক এর কাজও শুরু হয়েছে। এসব স্থানে যদি কোন প্রতিষ্ঠান শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে তাহলে তারা বিভিন্ন হারে ১০ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ পাবে।

দুইটি স্থানেই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে এবারের বাজেটে। ১০% কর দিয়ে এই টাকা বৈধ করা যাবে। আগে ফ্ল্যাট বা জমি কিনলে এই সুবিধা ভোগ করা যেতো। এবার জমি বাদ দিয়ে শুধু ফ্ল্যাট এবং বিল্ডিং-এ এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।

দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কিছু নির্দিষ্ট শিল্প খাতে বিনিয়োগ করলে বিভিন্ন হারে ১০ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ পাওয়া যায়। এই সুবিধা চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়েছিলো। পরে এবারের বাজেটে তা আবার বৃদ্ধি করা হয়েছে।

আগে ২১টি শিল্প খাত এবং ১৯টি অবকাঠামো উন্নয়নে এই সুবিধা দেওয়া হতো। এবারের বাজেটে তা কিছু বাড়িয়ে এই সুবিধার আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

নতুন করে যোগ করা হয়েছে কৃষি যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, মোবাইল সেট, খেলনা, এলইডি টিভি, প্ল্যাস্টিক রিসাইকেল, রাইস কুকার, ব্লেন্ডার, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি।

ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক টার্নওভার ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে আগে আয়কর মুক্ত ছিলো। এই খাতকে আরো উৎসাহীত করার জন্য এবারের বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।

হস্তশিল্প রপ্তানি থেকে আয় করমুক্ত ছিলো চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। এই সুবিধাও আরো পাচ বছর বৃদ্ধি করা হয়েছে এবারের বাজেটে। অর্থাৎ হস্ত শিল্প ব্যবসায়ীরা আগামী আরো পাচ বছর করমুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।

ব্যবসায়ীদের আরো যতো সুবিধা

বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮০% আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাদের এই অবদানের জন্য এই খাতের ব্যবসায়ীরা বহু আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের কর সুবিধা পেয়ে আসছে। তৈরি পোশাক খাত ১২% কর দিয়ে থাকে। আর যাদের পরিবেশ বান্ধব সনদ রয়েছে তাদের জন্য কর হার আরো ২% কম। অর্থাৎ তাদের জন্য কর হার ১০%। আর ট্যাক্সটাইল কোম্পানি কর দিয়ে থাকে ১৫% হারে।

এই সুবিধাও চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। তাদের অবদানের কথা মাথায় রেখে এই সুবিধা চালু রাখার কথা বলেছেন এবারের বাজেটে।

একই টাকার উপর বহুবার কর আরোপ করা হয় এধরনের অভিযোগ গত কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়ী মহল থেকে করে আসছিলেন। যেমন লভ্যাংশের উপর বার বার কর দিতে হয়। পরে গত বাজেটে নিবাসী কোম্পানির ক্ষেত্রে একবারই কর আরোপের বিধান রাখা হয়। কিন্তু অনিবাসী কোম্পানিগুলো এই সুবিধার বাইরে ছিলো। এবারের বাজেটে তাদেরকেও এই সুবিধার মধ্যে আনা হয়েছে।

আগে সর্বশেষ নিরূপিত আয় চার লাখ টাকা থাকলে অগ্রিম কর দিতে হতো। এখন তা বৃদ্ধি করে ছয় লাখ টাকা করা হয়েছে।

স্টক ডিভিডেন্ডের উপর ১৫% কর আরোপ

এই কর আরোপের ফলে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা হয়েছে ঠিকই কিন্তু তালিকাভূক্ত কোম্পানির জন্য ভালো হয়নি।

কোম্পানির শেয়ার মূলধন বৃদ্ধির একটি সহজ উপায় হলো শেয়ার ইস্যু করা। বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ বিতরন না করে শেয়ার ইস্যু করে যেমন লভ্যাংশ দেওয়া যায় আবার তেমনি কোম্পানির মূলধনও বৃদ্ধি করা যায়। এর ফলে কোম্পানির তারল্য সংকট হয় না। আবার শেয়ার ইস্যু করে শেয়ার মূলধন বৃদ্ধি করা যেমন সময় সাপেক্ষ ব্যাপার তেমনি ব্যয়বহুলও।

এর ফলে কোম্পানি অসুবিধায় পড়বে। তবে আইনে বলা হয়েছে, কোম্পানিকে ১৫% হারে আয়কর দিতে হবে যদি তার নগদ লভ্যাংশ বিতরন থেকে স্টক ডিভিডেন্ড বিতরন বেশি হয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় একদম নগদ লভ্যাংশ বিতরন না করেই সম্পূর্ণ স্টক বিতরনের মাধ্যমে লভ্যাংশ দেওয়া হয়।

নগদ লভ্যাংশের উপর জোর দেওয়ার পেছনে যুক্তি হলো, শেয়ার বাজারে ক্ষূদ্র বিনিয়োগকারীরা নগদ কিছু পাওয়ার আশায় বিনিয়োগ করেন। তারা যদি তা না পান তাহলে তারা হতাশ হন।

পুঞ্জিভূত মুনাফা, সঞ্চিতি, উদ্বৃত্ত ইতাদির উপর ১৫% কর আরোপ

চলতে বছরে অর্জিত মুনাফার সর্বোচ্চ ৭০% পর্যন্ত আপনি কোম্পানিতে রাখতে পারবেন। এর বেশি হলেই কোম্পানিকে ঐ বেশিটুকুর উপর ১৫% কর দিতে হবে।

ধরুন, কোন কোম্পানি তার হিসেব বছর শেষে কর পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১০০ টাকা। এর মধ্যে ৭০ টাকা আপনি অবন্টিত মুনাফা বা বিভিন্ন রিজার্ভ ফান্ড বা সারপ্লাস হিসেবে রাখতে পারবেন। এখন কোম্পানি যদি ৮০ টাকা রাখা তাহলে বাড়তি ১০ টাকার উপর ১৫% কর দিতে হবে।

অর্থ বিলে প্রস্তাব ছিলো অবন্টিত মুনাফা বা বিভিন্ন রিজার্ভ ফান্ড বা সারপ্লাস মিলে যদি পরিশোধিত মূলধনের ৫০% এর অধিক হয় তাহলে বাড়তি অংশের উপর ১৫% কর দিতে হবে। এটা নিয়ে সমালোচনার পরে চলতি বছরের মুনাফার ৭০% করা হয়েছে।

স্টক ডিভিডেন্ট এবং অবন্টিত মুনাফার উপর ১৫% কর আরোপের নেতিবাচক প্রভাব এখন বুঝা যাবে না। এর প্রভাব বুঝতে কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। আপতত, পুজি বাজারে বিনিয়োগকারীদের সুবিধা দেখলেও ভবিষ্যৎ এর দায় বহন করতে হবে।

সামাজিক কল্যাণ

করদাতার কাছ থেকে কর আদায় করে তা দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোই হলো সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহজেই আমাদের চোখে ধরা পড়ে। কিন্তু আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, দরিদ্র মানুষের কল্যাণ চোখে দেখা যায় না।

বয়স্ক ভাতা, মুক্তিযুদ্ধা ভাতাসহ অনেক সামাজিক কল্যাণে বাজেটের টাকা ব্যয় হয়। এই কল্যাণমূলক কাজের আওতা প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনেও সরকারকে ব্যয়ের পরিমান বাড়াতে হচ্ছে।

সরকার যেমন প্রত্যক্ষভাবে অর্থ দিয়ে নিজে সমাজ কল্যাণে কাজ করে আবার তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা বা করের পরিমান বাড়িয়েও সমাজের কল্যাণমূলক কাজ করিয়ে থাকে।

এ বছর প্রতিবন্ধি ব্যক্তিদের সুবধার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে হলো, কোন কোম্পানি যদি তার মোট জনবলের কমপক্ষে ১০% প্রতিবন্ধী নিয়োগ করেন তাহলে সে কোম্পানি তার করদায়ের উপর ৫% কর রেয়াত পাবেন। এর আগে হাসপাতালগুলোতে প্রতিবন্ধীরা যাতে সহজে আসতে পারে সে ব্যবস্থা রাখার জন্য বাড়তি কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছিলো। এবার তার আওতা বাড়িয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিওদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এরা যদি তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের আসার সহজ ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে অতিরিক্ত ৫% কর দিতে হবে।

আবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠনের সকল আয়কে করমুক্ত করা হয়েছে।

কর ব্যবস্থার সহজীকরন

আমাদের কর ব্যবস্থা ঝটিল। তাই অনেক করদাতাই কর দিতে সাহস করে এগিয়ে আসেন না। আবার কর অফিসে গেলে বিভিন্ন ধরনের হয়্রানির শিকার হন।

এ ধরনের অভি্যোগ বিগত অনেক আগে থেকেই শুনা যাচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে এই অভিযোগ কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এবারের বাজেটে উল্লেখ্যযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

রিয়্যাল এস্টেট কোম্পানির কাছ থেকে সাইনিং মানি হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের উপর উৎসে যে কর কর্তন করা হয় তাকে নূনতম এবং চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সম্পত্তি হস্তান্তর করে সৃষ্ট মূলধনী লাভকে উৎসে কর আদায় কে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

এতোদিন সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি তাদের গত আয় বছর থেকে ১৫% বেশি আয় দেখাতো তাহলে কর অডিট থেকে অব্যাহতি পেতো। এবারের বাজেটে তা বাতিল করা হয়েছে।

উৎসে কর রিটার্ন অডিটের অনুমোদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উপর ন্যাস্ত ছিলো। এখন থেকে তা সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে।

মোট ছয় বছর পর্যন্ত কর মামলা পুনঃউন্মোচনের অনুমোদনের সম্পূর্ণ ক্ষমতা অতি/যুগ্ম কর কমিশনারের উপর ন্যাস্ত করা হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে বাজেটের ধারা দেখে বুঝা যাচ্ছে চাকরীজীবী করদাতারা সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাদেরকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। যেমন, তাদের বেতন নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে ব্যাংকের মাধ্যমে প রিশোধের বিধান রয়েছে আয়কর আইনে। তাদের ব্যাংক স্ট্যাটমেন্টস থেকে সারা বছরের আয় সহজেই বের করা যায়।

প্রতি বছরই চাকরীজীবীদের উপর নতুন করে নিয়ম-কানুন আরোপ করা হয় যার ফলে তাদের সুবিধা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

অন্য যারা আছেন তাদের আয় অনেক সময়ই ব্যাংকের আওতার বাইরে থেকে যায়। এর ফলে তারা আয়কর আইনের এতো কড়াকড়ি নিয়মের মধ্যে পড়েন না। চাকরীজীবী করদাতারা অবহেলিতই থেকে যান।

  • লেখাটি সাপ্তাহিক বিপরীত স্রোত-এ প্রকাশিত হয়েছে।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

Shares