Money

ব্রেক্সিটঃ অনিশ্চয়তার দূলাচল

June 2, 2019
Brexit Image

ইউকে যতো দ্রুত ইইউ এর সাথে সমঝোতা করতে পারবে ততো দ্রুতই তারা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তবে এটা যদি ২২ মের আগে করতে পারে তাহলে ইইউ নির্বাচন থেকে ইউকে বাইরে থাকতে পারবে। কারন এর পরের দিনই ইইউ সংসদ নির্বাচন। এতে ইইউর ২৮টি দেশ অংশগ্রহণ করে।

তবে ইইউ এবং ইউকে রাজি হয়েছে আপাতত ব্রেক্সিট আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ রাখতে। কিন্তু এসবই হচ্ছে চুক্তি করা বা চুক্তি না করে ইইউ থেকে বেরিয়া আসা যেটা আনেটাই নির্ভর করছে দেশের সরকারগুলোর উপর।

ব্রেক্সিটের ফলে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন ব্যবসায়ীরা এবং ২৮টি দেশের নাগরিকরা। গত কয়েক বছর ধরেই ব্রেক্সিট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ইউকে বেড়িয়ে যাওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্য এবং এতোগুলো দেশের নাগরিক সুবিধা ঠিক করতে এখন আলোচনা হচ্ছে।

বিগত বছরগুলতে ২৮টি দেশের নাগরিকরা মুক্তভাবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছেন ব্যবসার জন্য, জীবিকার জন্য। এখন ইউকে ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে কি প্রভাব পড়বে। যে নিয়মে ব্যবসা চলতো ব্রেক্সিটের পর কিভাবে চলবে?

এই অনিশ্চয়তা থেকে রেহাই পেতে একটা ট্রানজিট পিরিয়ড চাচ্ছে ইউকে এবং ইইউ। এটা ধরা হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর ২০২০। তবে কেউ কেউ সন্দেহ করছেন এই সময়ের মধ্যেও এটা সম্ভব হবে না। তবে এই ট্রানজিট পিরিয়ড আরো এক বা দুই বছর বাড়তে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

মূলত ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত সময়ে কিভাবে ইউকে ইইউ থেকে বেড়িয়ে যাবে, ভবিষ্যৎ-এ ব্যবসা কিভাবে চলবে, নতুন করে চুক্তি করা, নাগরিকদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে চাইলে সেই ব্যবস্থা করা, এই বিষয়গুলো নিয়েই কাজ চলতে থাকবে আগামি বছরগুলোতে।

৫৯৯ পাতার ব্রেক্সিট ড্রাফট লেখা হয়েছে। এতে রয়েছে ইউকে ইইউ থেকে বেরিয়া যাওয়ার বিষয়। ট্রানজিশন সময়ে ইউকে ইইউর সকল নিয়ম মেনে চলবে কিন্তু তারা সদস্য পদ হারাবে। এই ট্রানজিশন সময় বাড়ানো যাবে তবে এটা কোনভাবেই এক বা দুই বছরের বেশি না।

আগামী বছরগুলোতে ইইউর সাথে কাজ চালিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন সম্পন্ন করার জন্য ইউকে-কে ৩৯ বিলিয়ন পাউন্ড দিতে হবে।

এই পরিমান বিশাল অর্থ দেওয়ার বিরুধী অনেক ইউকে নাগরিক কিন্তু ইইউর সাথে ভবিষ্যৎ বাবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এটা করতেই হচ্ছে। এখন ইউকে যদি ইইউর সাথে কোন চুক্তিতে না গিয়েই ইইউ থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে হয়তো এই অর্থ দেওয়া থেকে আপাতত বেচে যাবে।

কিন্তু এ নিয়ে আদালতে যেতে পারেন ইইউ এবং সেখানেই এটা নির্ধারিত হবে। তাই ইউকে চাচ্ছে একটা সমঝোতা করে ইইউর সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যেতে। মূলত দুই দিকের নাগরিক সুবিধা এবং ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করেই ইউকে এখন সংসদে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

ব্যবসার বাইরে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো নাগরিক সুবিধা। প্রচুর মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে জীবিকার কারনে পাড়ি দিয়েছেন। এই মানুষগুলো এখন রয়েছে একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে। তার তাকিয়ে আছে ব্রেক্সিটের দিকে।

যারা ইইউ দেশগুলো থেকে ইউকে এসেছিলেন তারা কি এখন ইউকেতে থাকবেন না কি তাদের নিজের দেশে বা অন্য ইইউ দেশগুলোতে আবার পাড়ি জমাবেন সেই সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন। আবার ঠিক একইভাবে, ইউকের নাগরিক যারা ইইউতে আছেন তারাও একই চিন্তায় আছেন।

কিন্তু আশার কথা হলো প্রাথমিক যে খসড়া চুক্তি রয়েছে সেখানে বলা আছে যারা যেখানে আছেন তারা ঠিক সেভাবেই থাকতে পারবেন। তাদের রেসিডেন্সি এবং কোন সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার কোন পরিবর্তন হবে না। এবং পাচ বছর থাকার পর তারা স্থায়ী নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আগে যেমন একটা মুক্ত চলাচল থাকতো এখন তা আর থাকবে না। ইউকে থেকে চাইলে যেমন অনায়াষেই ইইউর অন্য দেশগুলোতে গিয়ে কাজ করে আসতে পারতেন তা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

আবার ঠিক একইভাবে ইইউ দেশগুলোর নাগরিকদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নাগরিক সুবিধার কথা যেটা বলা হয়েছে সেটা হলো একটা দেশের মধ্যে এখন সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের পর কোন ইউকে নাগরিক যদি ইইউতে গিয়ে কাজ করতে চায় তাহলে পেশাগত যোগ্যতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এখন যেমন গ্রহনযোগ্যতা রয়েছে তেমনি সামনের দিনগুলোতেও ঠিক একইভাবে মূল্যায়ন করা হবে কিনা তা অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।

অনুদিকে ব্যবসায়ীরা যে যেভাবে পারছেন পণ্য মজুদ করছেন। ইউকে-র একজন পারফিউম বিক্রেতা বলছিলেন, তারা ইইউ থেকে সুগ্নদ্ধি কিনে রাখছেন। এটা অনেকেই করছেন। কেউ ছয় মাস আবার কেউ এক বছরের জন্য মজুদ করে রাখছেন।

ইইউর সাথে যদি চুক্তি না হয় তাহলে তখন ব্যবসা- বাণিজ্য কিভাবে হবে এই অনিশ্চয়তা থেকেই তারা এখনই বেশি বেশি কিনে রাখছেন। তবে এর জন্য তাদের এখন দরকার হচ্ছে প্রচুর বাড়তি নগদ টাকা। এই টাকা ম্যানেজ করা এখন তাদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এটা শুধু একজন বিক্রেতার কথা। এমন আগাম ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে সব ব্যবসায়ীকে। এবং এটা করতে হচ্ছে দুই দিকের ব্যবসায়ীদেরকেই। অর্থাৎ, ইইউ এবং ইউকে এই দুই দিকের ব্যবসায়ীদেরকেই এই ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। যদি কোন চুক্তি না হয় তখন যে অনিশ্চয়তা দেখা দিবে ঐ সময় যাতে তারা তাদের কাস্টমারদেরকে সেবা দিয়ে যেতে পারে।

এই আগাম কিনে রাখার কারনে পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে যার ধাক্কা লেগেছে ব্যবসায়ীদের মুনাফার উপর। মুদ্রার বিনিময় হার কি হবে এই অনিশ্চয়তাও আরেকটি বড় চিন্তার বিষয়।

ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা কি করবেন, কি ধরনের পদক্ষেপ নিবেন সে সম্পর্কে সরকারের তরফ থেকে এখনও স্পষ্ট করে কিছুই বলছে না।

তারা এখন অর্থ সঞ্চয় করছেন, খরচ কমানোর চষ্টা করছেন। এবং সামনে কি হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন।

ভোগ্য পণ্য  মজুদ করে রাখলে কয়েক মাস হয়তো নিরবচ্ছিন্নভাবে যোগান দেওয়া যাবে। কিন্তু মিউজিক এর ক্ষেত্রে কি হবে?

লাইভ শো, একটা মিউজিক রিলিজ হলে ইইউ বা ইউকে-তে সঙ্গে সঙ্গে রিলিজ দেওয়ার জন্য সবাই অপেক্ষা করেন। সেখানে ব্রেক্সিটের ফলে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির কি হবে?

এই নিয়ে মিউজিক শিল্পের সঙ্গে যারা আছেন তারাও একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।

মূলত এই নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্ভিগ্ন ইইউ শিল্পীরা। তাদের লক্ষ্য থাকে মিউজিক রিলিজ হওয়ার সাথে সাথেই ইউকে-তে রিলিজ দেয়ার জন্য। এর ফলে তাদের মিউজিক দ্রুত প্রচার পায়।

আরেকটি বড় বিষয় হলো, লাইভ পারফর্মেন্স। সব শিল্পীরাই চান কনসার্ট করতে এবং তাদের ফ্যানরা সরাসরি মিউজিক শুনতে। কিন্তু বিপদটা হলো, এখন যেমন শিল্পীরা সারা ইইউ জুড়ে শহরের পর শহর কয়েক মাস ধরে একাধারে কনসার্ট করে যাচ্ছেন কোন ভিসা ছাড়া সেটা ব্রেক্সিটের পর আর সম্ভব হবে না।

শিল্পীরা উদ্ভিগ্ন ব্রেক্সিটের পর তাদেরকে ভিসা নিতে হবে ইউকে ঢুকার জন্য এবং সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য। এ জন্য একদিকে যেমন বাড়তি খরচ হবে অন্যদিকে সময় ব্যয় হবে। আগে যেমন বিনা খরচে এবং বিনা বাদায় চলে যাওয়া যেতো তখন আর সম্ভব হবে না।

এই জন্য শিল্পীরা আলাদা ভিসার ব্যবস্থা করার জন্য বলছেন। তারা যাতে কম ঝামেলাতেই আসা-যাওয়া করতে পারেন সেই দাবি করছেন। এতো অনিশ্চয়াতর দূলাচলে এখন সামনে কি হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড় উপায় নেই।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares