Money

বাজেট ২০১৮-১৯: চাপে থাকবেন চাকরীজীবীরা

July 3, 2018
Budget 2018-19 Image

‘সমৃদ্ধ আগামী পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রী মি আবুল মাল আবদুল মুহিত যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংগ্রহ করবে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। জিডিপি ধরেছেন ৭.৮% এবং মূদ্রাস্ফীতি ৫.৬%। গত এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী মূদ্রাস্ফীতি ছিলো ৫.৬৩%।

৮৫ বছর বয়সী মি মুহিত এবার নিয়ে ২০০৯ সাল থেকে টানা দশ বার বাজেট দিয়েছেন। আর দেশের ৪৭তম বাজেটের মাধ্যমে তিনি প্রয়াত অর্থ মন্ত্রী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সাইফুর রহমানের সমান ১২টি বাজেট দিলেন।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২ লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। পরে তা ২ লাখ ২৫ হাজার কোটিতে নামিয়ে আনেন। প্রতিবারই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তবে রাজস্ব আহরণ প্রতি বছরই বাড়ছে। সেই আশাতেই হয়তো প্রতি বছরই বাজেটের আকার বাড়িয়ে চলেছেন। তবে স্বীধানতার পর থেকে প্রতি বছরই বাজেটের আকার বেড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই লক্ষ্যমাত্রা চারটি খাত থেকে সংগ্রহ করে। আয়কর, আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক, ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক।

এই চারটি খাত থেকে মূলত ব্যক্তি করদাতা এবং কোম্পানি করদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে। তাদেরকেই ভোগ করতে হবে এই বাজেটের সুবিধা-অসুবিধা।

ব্যক্তি করদাতা

সমাজের বিত্ত্ববানদের কাছ থেকে কর আহরণ করে তা সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের কাজে লাগানোই সরকারের উদ্দেশ্য।

কিন্তু যারা এখনো ঠিক এই বিত্ত্ববানদের দলে পড়ছেন না তারাও করের আওতায় চলে আসছেন ধীরে ধীরে। গত কয়েক বছর ধরে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকায় আটকে আছে। এই সীমা বৃদ্ধি করার দাবি উঠে আসছিলো বিভিন্ন মহল থেকে। এর পক্ষে বিভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরেছিলেন তারা। অর্থ মন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যেও এ কথা বলেছেন। কিন্তু গত বাজেটে যে উত্তর দিয়েছেন এবারও তিনি তাই বলেছেন।

তিনি বলেন, উন্নত দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা মাথাপিছু জিডিপি’র ২৫% এর নিচে। আর উন্নয়নশীল দেশে এটা মাথাপিছু জিডিপি’র সমান। আমাদের দেশে তা মাথাপিছু জিডিপি’র ২০০% এর বেশি। এই যুক্তি দেখিয়ে তিনি করমুক্ত আয়ের সীমা আগের অবস্থাতেই রেখে দেন।

তবে যাদের প্রতিবন্ধি সন্তান বা ডিপেন্ডেন্ট রয়েছে তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে।

২০১৬-১৭ বাজেট থেকেই মূলত করদাতাদের উপর করের সুবিধা কমতে থাকে।

করমুক্ত সীমা আড়াই লাখ টাকাতে স্থীর থাকার ফলে এবার নতুন করদাতার সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যাবে। প্রায় সব কোম্পানিতেই বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধি পায়। এই বেতন বৃদ্ধির ফলে নতুন কিছু করদাতা যোগ হবেন। আবার যারা আগে থেকেই কর দিয়ে আসছিলেন তাদের করের পরিমান বেড়ে যেতে পারে কয়েকগুণ।

ধরুন, আপনার গতবার যে করযোগ্য আয় ছিলো তার উপর সর্বোচ্চ কর দিয়েছিলেন ১৫%। কিন্তু এবার আপনার আয় বাড়ার কারনে তা ২০% গিয়ে পড়েছে। তাহলে আপনাকে প্রতি ১০০ টাকায় এখন বিশ টাকা দিতে হবে যেখানে আপনি গত বছর দিয়েছিলেন ১৫ টাকা।

আর যারা গত বছর করযোগ্য হননি তাদের বেতন বৃদ্ধির কারনে তাদের আল্টিমেট রেজাল্ট হতে পারে নেগেটিভ।

ধরে নিলাম, এই বছর আপনার বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে সব মিলিয়ে মাসিক ৫,০০০ টাকা। তাহলে বৎসরে ৬০,০০০ টাকা। আপনাকে সর্বনিন্ম কর দিতে হবে ৫,০০০ টাকা। এ বছর মুদ্রাস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫.৬%। ধরে নিলাম এটা এর মধ্যেই সরকার রাখতে সক্ষম হয়েছে। আপনার যদি মাসে ২০,০০০ টাকা গত বছরে খরচ হতো তাহলে এই বছর খরচ হবে ২১,১২০ টাকা। অর্থাৎ মাসে ১,১২০ টাকা করে বেশি খরচ হবে।

বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পাবে প্রতি বছরের মতো এবারও। তবে আশা করা হচ্ছে এবার বাড়িভাড়া একটু বেশি বৃদ্ধি পাবে কারন ৮ হাজার বর্গ ফুটের বেশি গৃহসম্পত্তি থাকলেই ৩ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হবে। যেহেতু গত বছরের তুলনায় তাকে এই বাড়তি টাকা কর হিসেবে দিতে হবে তাই সে স্বাভাবিকভাবেই ভাড়া বাড়িয়ে দিবে। ধরে নিলাম, ১ হাজার টাকা বাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।

এবার ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন, টিউটরের বেতন সব মিলিয়ে কতো বাড়বে তা আপনি নিজেই অনুমান করে নিন।

আপনার বছরে বাড়বে ৬০ হাজার টাকা। এবার আপনার সংসার চালাতে যে যে খাতগুলোতে বেশি খরচ হবে সেগুলো চিন্তা করে নিজেই নিজের পারিবারিক বাজেট করে নিতে পারেন। আশা করছি আপনি নেগেটিভ রেজাল্ট পাবেন।

সরকার তার ঘটতি মেটানোর জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ঋণের ব্যবস্থা রেখেছেন। কিন্তু আপনি কোথা থেকে এই ঘটতি মেটাবেন?

সরকার ব্যক্তিখাতে কর বসানোর সময় এই হিসেবটা করে নিতে পারতেন। চাকরীজীবীদের আয় সীমিত। কিন্তু তাদের বেতন ব্যাংকের মাধ্যমে ঢুকে বলে তাদেরকে শনাক্ত করাটা সহজ। এবং তার কারনে কর আইন প্রয়োগ করাটাও সহজ। তাই প্রতিবার তারাই সরকারের টার্গেটে পরিনত হন।

এটা নির্বাচনী বছরের বাজেট। অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার বাজেটে সবাই কিছু সুবিধা পাবেন সরকারের কাছ থেকে। কিন্তু চাকরীজীবীরা আশাহত হয়েছেন। তারা চিন্তিত কিভাবে সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালাবেন।

তবে একটা আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু সুবিধা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন তার বাজেট বক্তব্যে। যেমন, গতবার তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের কর্পোরেট ট্যাক্স রেট কমিয়েছিলেন। ভ্যাট আইন স্থগিত করেছিলেন।

নয় লাখ ব্যক্তি করাদাতার কথা চিন্তা করে আড়াই লাখ টাকা থেকে তা কিছুটা বাড়ানোর নির্দেশ দিলেও দিতে পারেন। এতে করে তার ইমেজ নির্বাচনী বছরে বাড়তে পারে।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রী পড়ে যাবেন বিপদে। গত বছর যে বিশাল বাজেট দিয়েছিলেন তা মূলত নতুন ভ্যাট আইনের উপর নির্ভর করেই দিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছিলো। এবং এটা স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলে অনেকে মন্তব্য করেছিলেন।

এবার যদি করমুক্ত আয় বাড়ানো হয় তাহলে তার রাজস্ব আয়ে টান পড়তে পারে। এই আশংকা তিনি করেছেন তার এবার বাজেট বক্তব্যে যখন তিনি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর ২.৫% কমানোর প্রস্তাব করেছিলেন।

অর্থ মন্ত্রীর টার্গেট হলো বেশি করে রাজস্ব আদায় করা। কারন, যেভাবে বাজটের আকার বাড়ছে সেই হারে আয় বাড়াতে হবে। আবার প্রতি বছরই ঘাটতি মেটাতে ঋণ নিতে হচ্ছে। এই ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়েও চলে যায় বাজেটের একটি বিরাট অংশ। এ জন্যও শুনতে হয় সমালোচনা।

তাই আয়ের পরিমান বাড়িয়ে ঘটতি যতো দ্রুতো কমিয়ে আনতে পারবেন ততো তাড়াতাড়ি ঋণের বুঝা কমবে এবং সুদ কম দিতে হবে।

আর এই আয়ের পরিমান বাড়াতে গিয়ে টার্গেট করতে হচ্ছে করদাতাদেরকে। তাই তাদের উপরেই পড়ছে এই চাপ। প্রতি বছরই করের আওতা বাড়ানো, সুবিধা সংকোচিত করা এবং করদাতার সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে গত কয়েক বছর ধরে করদাতাদের মধ্যেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাপক উৎসাহের মধ্যেই পালিত হচ্ছে কর মেলা। গত আয়কর মেলায় প্রায় দুই লাখ করদাতা তাদের রিটার্ন দাখিল করেছেন। আর সব মিলিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে প্রায় নয় লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করেছেন।

সরকার প্রতিনিয়তই চেষ্টা করে যাচ্ছেন আয়কর ব্যবস্থা সহজ করার জন্য যাতে করে করদাতাদের মধ্যে ভয় কাজ না করে। ধীরে ধীরে করদাতার সংখ্যা আগামী পাচ বছরে এক কোটি আশি লাখে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট নিয়েছে সরকার। বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা ৩৫ লাখ।

চারটি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় আসে ভ্যাট এবং সম্পূরক শুল্ক থেকে। কিন্তু এই চিত্র পাল্টাতে চান অর্থ মন্ত্রী। ২০২১-২২ অর্থ বছরের মধ্যে আয়কর খাত থেকেই মোট রাজস্বের অর্ধেকের বেশি আহরণ করতে চান। বর্তমানে তা ৩৫%। এক দশক আগেও তা ছিলো মাত্র ২০%।

করমুক্ত আয়ের দাবি যখন বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছিলো তখন এমনও শুনা গিয়েছিলো এটা বেড়ে ২৭০,০০০ টাকা বা ৩০০,০০০ টাকা হতে পারে। এর সাথে আরেকটা বিষয় শুনা গিয়েছিলো, করে হার সর্বনিন্ম ৭.৫% থেকে শুরু হতে পারে।

দুইটি খবরই ব্যক্তি করদাতাদেরকে আশান্বিত করেছিলো। এবং বাজেট প্রস্তাবের পর ঠিক উল্টোটাই হয়েছে। অর্থাৎ আশাহত হয়েছেন।

করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়লেও কর হার কিছুটা কমলেও স্বল্প আয়ের মানুষের উপর করের চাপটা কম পড়তো।

যাই হোক, সমাজে আয় বৈষম্য দূর করার জন্য ব্যক্তি করদাতার উপর সারচার্জ আরোপ করা হয়ে থাকে। এবার অর্থ মন্ত্রী সারচার্জ আরোপের আওতা কিছুটা বড়িয়েছেন। যে করদাতার দুইটি গাড়ি অথবা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আট হাজার বর্গ ফিট আয়তনের বাড়ি আছে তাকে কমপক্ষে তিন হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হবে।

যাদের ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা নীট সম্পত্তি অতিক্রম করবে তাদেরকে সর্বনিন্ম তিন হাজার টাকা এবং যাদের নীট সম্পত্তি ১০ কোটি টাকা অতিক্রম করবে তাদের সর্বনিন্ম পাচ হাজার টাকা সারচার্জ দিতে হবে।

সম্পদের পরিমান যাই হোক না কেন মোটরগাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা গৃহসম্পত্তি থাকলেই রিটার্নের সাথে সম্পদ বিবরণী দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কোম্পানি করদাতা

কর্পোরেট ট্যাক্স অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি এই অভিযোগও কয়েক বছর ধরে ব্যবসায়ী মহল থেকে উঠে আসছিলো। বেশি কর হারের কারনে ট্যাক্স ফাকি দিচ্ছে বা বিনিয়োগ এ দেশে আসছে না এমন কথাও উঠেছে। কিন্তু তাদের এই যুক্তিও অর্থ মন্ত্রী মানতে নারাজ।

তিনি বলেন শেয়ার বাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির কর ২৫% যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়ই কম। বিশ্বে গড় কর ২৪.২৯%। তবে তিনি স্বীকার করেন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করের হার কিছুটা বেশি অন্যান্য কর্পোরেট ট্যাক্সের তুলনায়। তাই তিনি এই সেক্টরে ২.৫% কর কমানোর প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, এর ফলে আমরা কিছুটা আয়কর কম পাবো কিন্তু বিনিয়োগকারীদের পজেটিভ সিগন্যাল দিবে।

অন্য কোথাও কর না কমিয়ে তিনি এমন একটি সেক্টরে কর কমানোর প্রস্তাব করেছেন যে সেক্টর গত কয়েক বছর ধরে তীব্র সমালোচনার মুখে আছে। কেউ কেউ বলছেন, জনগণের কষ্টের টাকা নিয়ে ঋণ খেলাপিদের দেয়া হচ্ছে। এই খাতে কর হার কমানোর সমালোচনা করেছেন অনেকেই।

পোশাক প্রস্তুতকারক এবং রপ্তানিকারকদের কর্পোরেট ট্যাক্স ১৫%-এ বৃদ্ধি করা হয়েছে। শেয়ার বাজারে নিবন্ধিত কোম্পানির কর ১২.৫%। আর পরিবেশ বান্ধব কোম্পানির ক্ষেত্রে ১২%। প্রতি বছরই এই হার বৃদ্ধি করা হয় এবং পরে আবার হ্রাস করা হয়। অতএব, এবারও এই সেক্টরের ব্যবসায়ীরা আশা রাখতে পারেন।

সমাজ সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবারও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। ডে ক্যায়ার হোম এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা হতে অর্জিত আয়কে কর অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। বিপরীতে কোন চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিদের চলাচল/সেবা গ্রহণের জন্য বিশেষ সেবা সুবিধা না রাখলে প্রযোজ্য করের ৫% অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। এই কর ২০১৯-২০২০ কর বছর থেকে কার্যকর হবে।

বিশ্বায়নের যুগে কর ফাকি প্রতিনয়তই বেড়ে চলেছে। মূলত প্রযুক্তির বিকাশের কারনে এই প্রবণতা বেড়েছে। ক্রমেই জটিল হচ্ছে লেনদেন ব্যবস্থা। বাংলাদেশও এর বাইরে না।

সেই কথা বলেছেন অর্থ মন্ত্রীও। তিনি এবার বাজেটে ভার্চ্যুয়াল এবং ডিজিটাল সেক্টরে কর বসানোর জন্য কর আইনে নতুন ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন। এর ফলে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ইত্যাদি কোম্পানির আয়ের উপর কর বসবে।

কিন্তু এই সেক্টরে কিভাবে কর সংগ্রহ করা হবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। এখানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী লেনদেন হয় না। অনলাইনে টাকা পরিশোধ হয় বলে ঠিকভাবে চিহ্নিত করাটাও মুশকিল। ব্যাংক খাতে যারা কাজ করেন তারাও এ কথা স্বীকার করেছেন।

উপরের টেক কোম্পানিগুলোর কারনে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা আমূল পাল্টে গেছে। এর ফলে বিপদে পড়েছে আমাদের দেশের প্রিন্টিং মিডিয়া। তারা বিজ্ঞাপন হারাচ্ছে। প্রিন্টিং মিডিয়াতে বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে বিজ্ঞাপন দেয়ার ক্ষত্রে উৎসে কর কেটে রাখা হয় যেটা অনলাইন কোম্পানিগুলর ক্ষেত্রে হচ্ছে না। তাই অসম প্রতিযোগিতা হচ্ছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্যাক্স আরোপের দাবী উঠেছিলো। আর আরেকটি বিষয় হলো, এই মাধ্যমে এখন অনেক বড় অংকের লেনদেন হচ্ছে এবং সেখান থেকে বড় একটা আয়ও সরকার হারাচ্ছে।

কিন্তু এখন বিষয় হলো, রাজস্ব বোর্ড কিভাবে এ খাত থেকে কর আদায় করবে। তাদের কি সে রকম ট্যাকনিকাল নলেজ রয়েছে?

যানঝট, ধূলাবালির শহরে পাঠাও এবং উবার খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হয়ে উঠে। কয়েক বছর না যেতেই রাইড শেয়ারিং এ সেবায় মোটরযান প্রদানকারীদের রিটার্ন দাখিল এবং ১২ ডিজিট টাআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই আয়ের উপর ৫% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে যারা এই মাধ্যমে যাতায়াত করতেন তাদের খরচ বেরে যাবে।

আগেই বলা হয়েছে চাকরীজীবীরা চাপে থাকবেন। তাদেরকে ভালো মতো টার্গেট করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। উৎসে করের রিটার্ন দাখিল না করলে, বেতনভোগী কর্মীদের বেতনভাতার বিবরণী দাখিল না করলে বা বেতনভোগী কর্মীদের রিটার্ন দাখিল বিষয়ক তথ্য দাখিল না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রিটার্ন অডিটের আওতায় আনা হবে। এর ফলে সকল চাকরীজীবী কঠিন নজরের মধ্যে পড়ে যাবেন।

রাইড শেয়ারিং সেবা যেমন জনপ্রিয় হয়েছে তেমনি বাংলাদেশে অনলাইন শপিং ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাজেট প্রস্তাবের দিন এই খাতে ৫% ভ্যাট আরোপর কথা উল্লেখ করা হয়। পরে এনবিআর-এর চেয়ারম্যান মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, বাজেট বক্তব্যে অনলাইন শপিং এর উপর ৫% ভ্যাট ভুলক্রমে ছাপা হয়েছিলো। যাক আপাতত নতুন এই খাত মুক্তি পেলো। আর এই খাত থেকে যারা কেনাকাটা পেলেন তারাও স্বস্থি পেলেন।

স্থানীয় মোবাইল উৎপাদন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করার জন্য সারচার্জ অব্যাহতি সুবিধা প্রদান করে মোবাইল সেট আমদানি পর্যায়ে ২% সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি ফোরজি চালু হওয়াতে স্মার্ট ফোন বিক্রির পরিমান উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাড়বে বলে এই খাতের ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন।

প্রস্তাবিত বাজেটে ১১০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ভ্যাট বেড়েছে আর অন্যদিকে ১১০১ থেকে ১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ভ্যাট কমেছে। এ ছাড়া পুরোনো ফ্ল্যাট পুনরায় নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ২% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর ফলেও নিন্ম আয়ের মানুষের উপর বাড়তি করের চাপ পড়বে।

সাবেক উপদেষ্ঠা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটকে জনতুষ্টিমূলক বলতে পারি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বাজেটে মাদ্রাসা ও স্কুলের সংস্কারে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধের কথা বলেন। এটা এক ধরনের নির্বাচনী ঘুষ। এটা এমপিরা তদারকি করে থাকেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, এ ধরনের প্রকল্পে কি হয় তা আমরা ভালো করে জানি।

তিনি বলেন, ১০০ টাকার একটি কাজে ব্যয় হচ্ছে ১,০০০ টাকা। বিভিন্ন মাধ্যম থেকেও আমাদের দেশে অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ব্যয়ের পরিমান বেশি তা বলেছেন। কেন এই বেশি ব্যয় হয় তাও মিডিয়াতে এসেছে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি পদ্মা সেতুর প্রকল্পে ১,৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা বলেন।

মি রহমান জনতুষ্টির বাজেট বললেও একটি প্রতিবেদনে বাজেটকে উচ্চবিত্তের তুষ্টি, মধ্যবিত্তের কষ্ট হিসেবে উল্লেখ করেছে।

*লেখাটি সাপ্তাহিক বিপরীত স্রোতে প্রকাশিত হয়েছে।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares