Money

চায়নার ঋণ, বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ব্যবহারে সতর্কতা

January 9, 2018
China Investment Image

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ঋণ নেয়ার চুক্তি হতে যাচ্ছে চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে সফরের মধ্য দিয়ে।

প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।

যে ঋণের কথা বলা হচ্ছে তা মূলত দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে রুপান্তরের জন্য এখন থেকেই বড় আকারের ঋণ নেওয়ার কথা বলে আসছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।

অর্থমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন।

চায়নার কাছ থেকে যে ঋণ নেয়া হবে তা দিয়ে দেশের যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প এবং জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

এইসব খাতে মোট ২১টি প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে যার মধ্যে রেলখাতে চারটি, সড়ক পরিবহন খাতে চারটি, বিদ্যুৎ খাতে চারটি, জীবনমান উন্নয়নে পাচটি, শিল্প খাতে দুইটি এবং জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি করে প্রকল্প রয়েছে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল প্রকল্পও এর মধ্যে রয়েছে।

এখন এই যে বাংলাদশের উন্নয়নের জন্য বিশাল আকারের ঋণ নেয়া হচ্ছে তার শর্ত বিশেষত সুদের হার কত হবে তা এখনও ঠিক হয়নি।

কিন্তু তার আগেই আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বেশি সুদে হলেও তিনি ঋণ নিতে আগ্রহী। বেশি সুদে ঋণ নেয়ার পেছনে তার যুক্তি হলো, বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে বিশেষত বেসরকারি খাতে।

আর আরেকটি বিষয় তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে কিছুদিন আগে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। তাই এখন আমাদের আগের মত কম সুদে দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে।

এদিকে আমাদের এখন বড় বড় প্রকল্পও দরকার মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে রুপান্তর হওয়ায় জন্য। এবং সেই ঋণ বেশি সুদে পরিশোধ করার মত সামর্থও আমাদের রয়েছে বলে মনে করেন আর্থমন্ত্রী।

এর আগে পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারির কারনে বিশ্ব ব্যাংক যখন তাদের ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব তুলে নিয়েছিলো তখনও চায়না ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলো। কিন্তু সুদের হার বেশি থাকার কারনে বাংলাদেশ পিছিয়ে এসেছিলো।

১৯৭৫ সালের পর থেকে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। সেই ধারাবাইকতাই চায়নার সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঋণের চুক্তি হতে চলেছে।

চায়না শুধু বাংলাদেশেই তার বিনিয়োগের পরিমান বাড়াতে চাচ্ছে এমনটা নয়। তারা সারা বিশ্বেই তাদের বিনিয়োগের পরিমান বাড়াতে ব্যস্ত।

বিশ্বে এই মূহূর্তে যত বড় বড় কম্পানি কেনাবেচা হচ্ছে তার বেশিরভাগই তারা কিনে নিচ্ছে।

বাংলাদেশে কিছুদিন আগে জঙ্গি হামলার কারনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও তারা সেটা নিয়ে চিন্তিত নয় বলে মিডিয়াতে খবর এসেছে। বরং তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী।

চায়না যে সারা বিশ্বে তাদের বিনিয়োগের পরিমান বাড়িয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে ২৩ সেপ্টেম্বর বিবিসিতে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যাতে বলা হয়েছে চীনে যত বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে তার চেয়ে বেশি তারা বিদেশে বিনিয়োগ করেছে।

২০১৫ সালে প্রথমবারের মত বিদেশি কম্পানির সেদেশে বিনিয়োগের চেয়ে তাদের কম্পানির বিদেশে বিনিয়োগের পরিমান ছিলো বেশি।

তাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমান ছিলো ১৩৫.৬ বিলিয়ন ডলার আর চীন অন্য দেশে বিনিয়োগ করেছিলো ১৪৫ বিলিয়ন ডলার যা আগের বছর ছিলো ১১১ বিলিয়ন ডলার।

চীন যে দুনিয়াব্যাপি এতো বিনিয়োগ করে যাচ্ছে সেই অর্থ যোগান দেওয়ার জন্য তাদের দরকার প্রচুর নগদ অর্থ। জানা যায়, এখন চীনের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে।

জুন ২০১৬-তে চীনের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ছিলো ৩.২১ ট্রিলিয়ন ডলার। এটা বিশ্বের মোট জিডিপি’র ৪.৩% এবং ইনডিয়ার রিজার্ভ থেকে ৫০% বেশি।

চীনের হাতে এই বিশাল অংকের রিজার্ভ থাকার পেছনে আছে তাদের বিশাল অংকের রপ্তানি এবং বিপরীতে কম করে আমদানি।

২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এর প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চীন ২,২৭৫ বিলয়ন ডলার রপ্তানি করেছে যা বিশ্বের মোট রপ্তানির ১৩%।

অন্যদিকে ১,৫০৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে ইউএসএ আছে দ্বিতীয় অবস্থানে।

কিন্তু আমদানির ক্ষেত্রে এই চিত্র উল্টা।

ইউএসএ ২,৩০৮ বিলিয়ন ডলার আমদানি করেছে যা বিশ্বের মোট আমদানির ১৪%।

কিন্তু চীন আমদানি করেছে ১,৬৮২ বিলিয়ন ডলার যা বিশ্বের মোট আমদানির ১০%।

কিন্তু উপরের চিত্র থেকে চীন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে।

এর পিছনে কিছু কারনও রয়েছে।

চীনে রয়েছে বিশ্বের সব নামি মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির ফ্যাক্টরি।

আগে উৎপাদন খরচ কম পড়তো বলে সবাই সেখানে ফ্যাক্টরি স্থাপন করেছিলো। তাই চীন গত কয়েক দশক ধরে ‘বিশ্বের ফ্যাক্টরি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে আসছিলো।

তাদের যে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছিলো তার পেছনে এটাই ছিলো প্রধান কারন।

কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন তাদের দেশে উৎপাদনের হার কমে গেছে।

কারন, তাদের দেশে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে কম্পানিগুলো অন্য দেশে বিশেষত যেখানে খরচ কম পড়বে সেদেশে চলে যাচ্ছে। মূলত বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার এটাই হলো আসল কারন।

এজন্য কয়েক বছর ধরে চীনের প্রবৃদ্ধিও নিচের দিকে যাচ্ছে। তাদের প্রবৃদ্ধি এখন ৬.৩% যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।

অন্য দিকে চীন রপ্তানিমুখি নীতি থেকে ভোক্তা নীতি অনুসরণ করা শুরু করেছে।

চীনের রয়েছে ১৩৮ কোটির উপরে জনসংখ্যার (১০ অক্টোবর ২০১৬) নিজস্ব বিশাল বাজার সেই সাথে ক্রমাগত কয়েক দশক ধরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি।

চীন ভোক্তা নীতি অনুসরণ করার পেছনে কারন হলো, এই মূহূর্তে আমেরিকা সবচেয়ে বেশি আমদানি করে থাকে। অনেক দেশই তাদের দেশে রপ্তানি করে থাকে।

তাই যেই দেশ তাদের দেশে রপ্তানি করে থাকে সেই দেশকে আমেরিকার কথা গুরুত্ব দিতে হয়। আমেরিকা চাইলে সেই দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এখন চীন যদি আমদানির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে পারে তাহলে চীন সেই জায়গা দখল করতে পারবে। তারাও বিশ্বে প্রভাব ফেলতে পারবে।

যেমন, কোন কম্পানির পন্য যে ক্রেতা সবচেয়ে বেশি কিনে থাকে সেই ক্রেতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে অন্যান্য ক্রেতা থেকে।

চীন সেই কাজটাই করতে চাচ্ছে। তারা দ্বিতীয় অবস্থান থেকে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে এক নাম্বারে যেতে চাচ্ছে।

তাই ঋণ চুক্তির পাশাপাশি কিভাবে চীনে রপ্তানির পরিমান বাড়ানো যায় সে বিষয়েও চেষ্টা করতে পারে বাংলাদেশ।

ভোগ নীতির পাশাপাশি চীনের এখন স্ট্রেটেজি হলো দেশের বাহিরে যাওয়ার। অর্থাৎ বিদেশে তাদের বিনিয়োগের শাখা-প্রশাখা বাড়ানো।

এটা চীনের সরকারি এবং বেসরকারি সকল কম্পানির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

কিন্তু এই বিনিয়োগের মধ্যে সব যে বাইরে কম্পানি কেনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে তাই না। এই সুযোগে কিছু অপব্যবহারও হচ্ছে।

চীনের ধনী পরিবারগুলো দেশের বাহিরে তাদের সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে। চীনের ধীর গতির প্রবৃদ্ধি এবং তাদের মুদ্রার বিনিময় হার কম থাকার কারনে তারা এই কাজটা করছে।

যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে চীন বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।

এদিকে বাংলাদেশেরও উন্নয়নের জন্য বড় আকারের ঋণ দরকার।

তাই বেশি সুদে ঋণের কথা অর্থমন্ত্রী বললেও ধর কষাকষি করে যতটুকু সুদের হার কমানো যায় সেই চেষ্টা নিশ্চয় অর্থমন্ত্রী করবেন।

তার সাথে সবচেয়ে বড় যেটি দরকার তাহলো সঠিক পরিকল্পনা। কিভাবে ঋণের টাকা দিয়ে দেশের সবচেয়ে ভালো করা যায় সেই সদিচ্ছা থাকতে হবে। ভালো পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়নের পরিবর্তে যেন শুধু ঋণের বোঝা না বাড়ে সে বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

এর কারন হলো বড় আকারের ঋণ নিতে আগেও দেখা গেছে।

বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে কেমন উন্নয়ন হয়েছে তা মিডিয়ার কল্যাণে দেশের মানুষ জেনেও আসছে। বাশ দিয়ে ছাদ ঢালাই দেওয়ার খবর বেশি দিনের পুরোনো নয়।

চায়নার সাথে বড় আকারের ঋণ নিয়ে হয়ত একটা ভালো ইতিহাস গড়া যাবে।

কিন্তু এই ঋণের টাকা দিয়ে যেন এমন কোনো কলঙ্কজনক ইতিহাস না হয় যাতে করে আমাদের সারা জীবন সেই কলঙ্ক বয়ে বেড়াতে হয়।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

Shares