Money

ক্লাসিফাইড লোন, পুকুর চুরি এবং সাগর চুরি

January 9, 2018
Classified Loan Image

কোন ব্যাংকের ক্লাসিফাইড লোনের পরিমান যদি মোট আউটস্টেন্ডিং লোনের ৫% এর বেশি হয় তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা জানাতে বলেছে। এবং এর সাথে ব্যাংকগুলো এই লোনের বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ নিয়েছে তাও জানাতে বলেছে।

এ ব্যাপারে ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে রেসপন্স পাওয়ার পর কিভাবে এই হার কমানো যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই পদক্ষেপ নেয়ার কারন হলো, চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টারে এই হার বেড়ে ২৩%-এ দাড়িয়েছে যার টাকায় পরিমান হবে ১২০ বিলিয়ন।

গত জুনে মোট ক্লাসিফাইড লোনের পরিমান ছিলো ৬৩৩.৬৫ বিলিয়ন টাকা যা ছয় মাস আগে অর্থাৎ গত ডিসেম্বর ২০১৫-তে ছিলো ৫১৩.৭১ বিলিয়ন টাকা।

যাদের ৫% এর বেশি নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) রয়েছে তার মধ্যে সরকারি মালিকানাদিন ছয়টি, প্রাইভেট ব্যাংক ১৮ টি এবং চারটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে।

কেন লোন ক্লাসিফাইড হয়?

আর লোন ক্লাসফাইডের পরিমান বেড়ে গেলে কি প্রভাব পরে?

লোন ক্লাসফাইড হওয়ার বিভিন্ন কারন থাকে।

ব্যাংক সাধারন ডিপোসিটরদের কাছ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় নিয়ে তা একত্র করে ব্যবসায়িদের বড় লোন দিয়ে থাকে। যদি এই লোন ক্লাসফাইড হয় তখন ব্যাংক বিপদে পরে যায়।

আর ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হলে এর ধাক্কা লাগে দেশের অর্থনীতির উপর। এজন্যই ক্লাসিফাইড লোন বেড়ে গেলে তা উদ্ভেগের কারন হয়ে দাড়ায়।

চলুন জেনে নেই লোন ক্লাসিফাইড হওয়ার প্রধান পাচটি কারন।

৫. ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে থাকেন ব্যবসায়ের আকার বড় করে বেশি করে প্রফিট করার জন্য। কিন্তু ব্যবসা যে সবসময় প্রফিট করবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

এজন্যই ব্যবসায়ে সব সময় রিস্ক থাকে।

এখন যে ব্যবসা প্রতিষ্টান লোন নিলো তার যদি ব্যবসা খারাপ যায় তাহলে তার টাকা ইনকাম কম হবে। এবং এর ফলে সে ঠিকমত লোন পরিশোধ করতে পারবে না।

এবং একটা সময়ে লোন ক্লাসিফাইড হয়ে যাবে।

৪. লোন নিয়েছেন কিন্তু যে শিল্পের জন্য নিয়েছেন তা পরিচালনা করার জন্য যদি সাপোর্ট না পান তাহলেও তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।

এবং এক সময় ব্যবসা করতে না পেরে লোন পরিশোধ করতে পারবেনা। যার পরিনতি হলো ক্লাসিফিকেশন।

যেমন কয়েক বছর আগে যখন গ্যাসের সাপ্লাই কমে গিয়েছিলো তখন যেসব কম্পানি সিনজি স্টেশন এর জন্য লোন নিয়েছিলেন তারা বিপদে পরে যান। কারন তাদেরকেও নতুন করে গ্যাস লাইন সংযোগ দেওয়া হচ্ছিলো না।

শুধু তাই নয় যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠান তখন নতুন করে গড়ে উঠছিলো তারাও নতুন গ্যাস সংযোগ না পেয়ে ব্যবসা থেমে যায়।

এখন তারা যদি প্রডাকশনে যেতে না পারে তাহলে ইনকাম করবে কি করে? লোন পরিশোধ তো অনেক পরের কথা।

আবার ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে টানা রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় ব্যবসায়িরা অনেক বিপদে পরে যান বিশেষত গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারাররা।

তখন শুনা গিয়েছিলো ট্রাক ভাড়া রেগুলার ভাড়া থেকে আট থেকে দশগুন বেশি ভাড়া দিয়ে তারা চিটাগাং মাল পাঠিয়েছেন শিপমেন্টের জন্য।

আবার কেউ কেউ এয়ারে পাঠিয়েছেন। অনেকে শিপমেন্ট ফেইল করেছেন।

এই যে বেশি কস্ট হলো মাসের পর মাস তারা এই টাকা কোথায় পাবে?

তারা তখন ব্যবসা চালাবে না লোন পরিশোধ করবে?

যার ফলে তখন লোন ক্লাসিফাইডের পরিমান বেড়ে গিয়েছিলো।

এখানে শুধু গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রির কথা উদাহরন হিসেবে দেওয়া হলো। এমন ঘঠেছে দেশের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে।

৩. ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার প্রবনতা কিছু মানুষের থাকে। তবে এই ধরনের মানসিকতার মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে খুবই কম। এবং আমরা তাদেরকে চিনি।

তাদের সংখ্যা খুব কম হলেও তাদের লোনের পরিমান খুবই বেশি।

২. ঋণ দেওয়ার আগে কোলাটেরাল সিকিউরিটি ফিজিক্যাল ভেরিফিক্যাশনে যেতে হয়। সেখান থেকে ফিরে একটি রিপোর্ট দিতে হয়। এর সাথে ভ্যালুয়েশন রিপোর্টও সাবমিট করতে হয়।

অনেক সময় এই কাজগুলো অবহেলা করে যথাযথ রিপোর্ট দেওয়া হয়না।

আসলেই কি যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লোন নিচ্ছে তার কোন অস্তিত্ব আছে কিনা বা থেকে থাকলে প্রডাকশন রানিং কিনা তা দেখা হয় না। যার ফলে একটি রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে লোন সেংশন হয়ে যেতে পারে।

যার পরিনাম হলো ক্লাসিফিকেশন।

এটা যেমন ব্যাংক কর্মকর্তার অবহেলার জন্য হতে পারে আবার তেমনি ব্যবসায়ীর সাথে সেই ব্যাংক কর্মকর্তার অবৈধ যোগসাজসেও হতে পারে।

১. লোন ক্লাসিফাইড হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করে কর্মকর্তাদের প্রভাব।

তারা এই প্রভাব পেয়ে থাকেন উপরমহল থেকে।

এখানে সরাসরি ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে কোন নিয়ম না মেনে অসৎ লোকদেরকে ঋণ দিয়ে থাকেন। এই ঋণের পরিমান হল বিশাল যদিও কিছু মানুষের কাছে এ অংক কিছুই না।

এই লোন দেয়াই হয় ফেরত না পাওয়ার জন্য। এই ধরনের বিশাল কেলেঙ্কারি আমাদের কাছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুকুর চুরি আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাগর চুরি নামে পরিচিত।

এই পুকুর চুরি বা সাগর চুরি যাই বলি না কেন তার কয়েকটি উদাহরনের সাথে আমরা বিগত কয়েক বছর ধরে পরিচিত।

এর মধ্যে আছে হল- মার্ক।

হল-মার্ক গ্রুপ ভুয়া ডকুমেন্টস তৈরি করে আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলো। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে হল-মার্ক গ্রুপ এটা করেছিলো। এবং জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা হয়।

সোনালী ব্যাংকের ঐ শাখায় এটাই শেষ না।

হল-মার্ক কেলেঙ্কারি ঘটনার তদন্তে গিয়ে ব্যাংকের ওই শাখা থেকে আরও পাচটি প্রতিষ্ঠানের একই কায়দায় ঋণ জালিয়াতির সন্ধান পায় দুদক।

ওই পাচ প্রতিষ্ঠানের একটি প্যারাগন নিট কম্পোজিট; প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ২ কোটি ২২ লাখ ৭৮ হাজার ৬১০ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে মামলায় বলা হয়।

শুধু সোনালী ব্যাংকই নয় এর সাথে যোগ দিয়েছে বেসিক ব্যাংক-ও।

বেসিক ব্যাংকের দিলকুশা, গুলশান ও শান্তিনগর শাখা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা তুলে আত্মসাতের অভিযোগ উঠে।

পরে এই অনিয়মের ঘটনায় অপসারিত হন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার সাথে ব্যাংকের সাত কর্মকর্তাকেও বরখাস্থ করা হয়। এরপর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানেও তার দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

এখন এই যে কেলেঙ্কারি হচ্ছে তার পেছনে রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের দিকে অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে।

এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ নিয়ে যখন সমালোচনা উঠেছিলো তখন অর্থমন্ত্রী এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এর পরে যেসব আর্থিক কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশিত হয় তার সাথে দেখা যায় তাদের প্রভাব ছিলো।

যেমন তদন্ত করে সে সব অনিয়মের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছিল। সে সুপারিশের পরে পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়।

এবং সোনালী ব্যাংকে বহুল আলোচিত হল-মার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গেও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশে সেই পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।

এখন এই এনপিএল কমিয়ে আনার জন্য ব্যাংক ঋণ দেয়ার আগে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে ঋণ দিতে হবে।

এবং ঋণ দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে না থেকে রেগুলার মনিটরিং করতে হবে।

এর সাথে সবচেয়ে বেশি যেটি দরকার তাহলো রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে।

এবং প্রফেশনাল ব্যাংকার দিয়ে ব্যাংক পরিচালনা করতে হবে।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares