Money

বিগ শর্ট প্লেয়ারঃ আমেরিকা ২০০৮ এবং বাংলাদেশ ২০১০

January 9, 2018
Big Short Player Image

দি বিগ শর্টঃ ইনসাইড দি ডোমসডে মেশিন নামে জার্নালিস্ট মাইকেল লুইস ২০১০ সালে একটি বই লেখেন। বইটির বিষয় হলো, ২০০৫-০৮ সময়ে আমেরিকাতে হাউজিং এবং ক্রেডিট মার্কেটের উত্থান এর উপর।

বইটি রিলিজের পর টানা ২৮ সপ্তাহ দি নিউ ইয়র্ক টাইমস এর বেস্ট সেলার তালিকায় অবস্থান করে। এবং যাদের সম্পর্কে এই বইটিতে লেখা হয়েছে তারা নেশনাল হিরু তে পরিণত হন।

বইটির পেপার এডিশনের হিউজ সাক্সেসের পর মুভি মেকাররা আগ্রহ প্রকাশ করেন মুভি তৈরি করার জন্য। পরে ডিরেক্টর টম ম্যাকার্থি একই নামে মুভি নির্মান করেন ২০১৫ সালে।

মুভিটি রিলিজের পর প্রশংসিত হয় দর্শক এবং মুভি কৃটিক উভয়ের কাছ থেকেই। আর এর ফল দেখা যায় অস্কারে যখন মুভিটি বেস্ট পিকচার, বেস্ট ডিরেক্টরসহ মোট পাচটি ক্যাটেগরিতে নমিনেশন পায়।

২০০৫ সালে কয়েকজন বুঝতে পারেন আমেরিকাতে হাউজিং মার্কেটের অবস্থা ভালো না। এই সেক্টর থেকে রিটার্ন খুবই কম আসছে। তারা প্রেডিকশন করেন হাউজিং মার্কেটের কলাপস হবে। তারা মনে করেন এই সিচুয়েশনে তারা ভালো গেইন করতে পারবেন। তাই তারা ব্যাংকের কাছে যান ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ করার জন্য।

ব্যাংক তাদের এই প্রস্থাবে রাজি হয়। কারন ব্যাংক মনে করেছিলো হাউজিং মার্কেটের কখনোই পতন হবে না। কিন্তু তাদের এই ধারনা ভুল প্রমানিত হয় ২০০৮ সালে। এর ফলে ব্যাংকগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ে।

কিছু ইনডিবিজোয়াল ইনভেস্টরও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। যেমন হোই হাবলার নয় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েন যা ইতিহাসে এককভাবে সর্বোচ্চ। আর উল্টো দিকে লাভবান হন যারা প্রেডিকশন করেছিলেন এবং ব্যাংকের সাথে ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ করেছিলেন।

যারা প্রেডিকশন করেছিলেন তাদের একজন বেন রেকার্ট বলেন, মানুষ তার বাড়ি, চাকরি, রিটায়ারম্যান্ট সেভিংস, পেনসনের টাকা সবই হারিয়েছেন। এবং বেকারত্বের হার ১% বেড়ে গেছে এবং দুঃখজনক হলো ৪০,০০০ মানুষ মারা গেছেন।

বাংলাদেশের মানুষ এই ধরনের অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালে। ১৯৯৬ সালের পর ২০১০ সালে কেন সাধারন মানুষ আবার শেয়ার মার্কেটে টাকা ইনভেস্ট করলেন? তারাও কি মনে করেছিলেন যে শেয়ারের দাম কেবল দিনের পর দিন বাড়তেই থাকবে? একটা কম্পানির শেয়ারের দাম কতো বাড়বে? কেনই বা একটা কম্পানির শেয়ারের দাম বাড়বে?

এই চিন্তা কি তখন কেউ করেছিলেন? হয়তো করেছিলেন।

কিন্তু যেভাবে শেয়ারের দাম বেড়ে যাচ্ছিলো তাতে করে ইনভেস্টররা হয়তো মনে করেছিলেন ১৯৯৬ সালের ঘঠনা আর ঘঠবে না। কিন্তু তাদের সেই আশা ভুল হয়। শেয়ার মার্কেটের পতন হয়। রাতারাতি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারিরা নিঃস্ব হয়ে পড়েন।

তারা হারান তাদের তিল তিল করে জমানো টাকা, বাবার পেনশনের টাকা, মার গহনা বিক্রির টাকা, বাবার জমি বিক্রির টাকা, অন্যের কাছ থেকে ধার করা টাকা। এই টাকা হারিয়ে তারা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। পরিবারগুলো সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েন।

কিন্তু লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর টাকা যে গুটিকয়েক মানুষের পকেটে গেছে তারা কিভাবে টাকা কামালেন? তারা কি দি বি শর্ট মুভির এক্সপার্টদের মত বুঝতে পেরেছিলেন শেয়ার মার্কেট এক সময় পড়ে যাবে। না তারা এক্সপার্ট ছিলেন না। তারা শেয়ার মার্কেট কারসাঝি করে উঠিয়েছেন। এবং একটা সময়ে তারা টাকা নিয়ে মার্কেট থেকে বেরিয়ে পড়েন। দি বিগ শর্ট মুভিতে যারা হয়েছিলেন হিরু আমাদের এখানে তারা হয়েছেন বিলেইন। যদিও অফিসিয়ালি আমরা তাদের নাম জানিনা।

বংলাদেশে একের পর এক ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। এই জন্যই হয়তো কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে লিখবেন সেটা ঠিক করতে পারছেন না। আর যদি কেউ লিখেই ফেলেন তার অবস্থা কি হবে সেটার কথাও চিন্তা করেই হয়তো অনেকে লেখার সাহস পাননা। কারন শেয়ার কেলেংকারির পর যে কমিশন হয়েছিলো তারা একটি রিপোর্ট সাবমিট করেছিলেন। সেই রিপোর্টে কি ছিলো তা দেশের জনগণ জানতে পারেননি। শুনা যায় তারা এতোটাই ক্ষমতাশালী যে তাদের নাম প্রকাশ করতে বা তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে সরকারের কেউ সাহস পাননি।

তবে কেউ যদি সাহস করে লিখেও ফেলেন সেটা জনপ্রিয় হলে মুভি তৈরি করা হবে কিনা সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। কারন বই প্রকাশ করতে কোন সরকারি সংস্থার পূর্ব অনুমতির দরকার হয়না। প্রকাশের পর সরকার চাইলে বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। কিন্তু মুভির ক্ষেত্রে রিলিজের পূর্বে সেন্সর বোর্ডের অনুমতি নিতে হয়। আর সেখান থেকে যে অনুমতি মিলবে না সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

বাংলাদেশে এখন ব্যাংক ইন্টারেস্টে রেট ক্রমেই নিচের দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাংকে যদি কেউ ডিপোজিট রাখতে চান তার রিটার্ন খুবই কম। সরকারি ইন্সট্রুমেন্টের রিটার্নও কম। এই ক্ষেত্রে মানুষের অলস টাকা ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়গের সম্ভাবনা ছিলো। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা তাদের আত্নবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন না।

তারা ২০১০ সালের পর ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আবার কবে মানুষ শেয়ার মার্কেটে ফিরে আসবে তা বলা যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশে যারা শেয়ার মার্কেট থেকে সাধারন বিনিয়োগাকারীদের কাছ থেকে ১৯৯৬ সালে এবং ২০১০ সালে টাকা হাতিয়ে নিতে পারদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন তারাই হয়তো এ ব্যাপারে ভালো জানেন।

তবে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগের পূর্বে সাধারন বিনিয়োগকারীদের সব সময়ই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারন শেয়ারের প্রাইস ক্যালকুলেশন খুবই জটিল। একটা কম্পানির ফাইনানশিয়াল স্টেটমেন্টস, দেশের ইকনমিক ফ্যাক্টর, কম্পানির ইনর্ফমেশন যেগুলো শেয়ার প্রাইস নির্ধারনে ভূমিকা রাখে সেগুলো শেয়ার প্রাইস নির্ধারনে জড়িত। বিভিন্ন জটিল সূত্র ব্যবহার করে শেয়ার প্রাইস নির্ধারন করতে হয়। তবে এই ক্যালকুলেশন যে সব সময় সঠিক হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। শেয়ার প্রাইস যেকোন সময় কমতে বা বাড়তে পারে।

তবে ইন্সটিটিউশনাল ইনভেস্টররা এক্ষেত্রে এগিয়ে এলে শেয়ার মার্কেটের অবস্থা ভালো হতে পারে। কারন সেখানে এক্সপার্ট লোক থাকবে। তারা সব ইনফর্মেশন বিবেচনায় নিয়ে পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট ফলো করে ইনভেস্ট করবেন। তবে কেউ হয়তো বলবেন, আমেরিকাতে বড় বড় ব্যাংক বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লস করেছে। তাদেরতো এক্সপার্ট ছিলো। তাহলে তারা কেন লস করলো। সে ক্ষেত্রে দুইটা বিষয় বলা যায়। এক. ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত আত্নবিশ্বাস। দুই. ব্যাংকগুলোর উন্মাদনা।

তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো, সেখানে কিছু ডিজাস্টার হলে কেন হলো তার কারন খুজে বের করার চেষ্টা করা হয়। এবং সেগুলো সবাই জানতে পারেন। সেগুলো যাতে আর না হয় সেজন্য সেফগার্ড ব্যবহার করা হয়। যেটা আমাদের এখানে নেই।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares