Money

টেসকো অ্যাকাউন্টিং স্ক্যানডাল অডিট ফেইল এক্সপেক্টেশন গ্যাপ

January 9, 2018
Tesco Scandal

টেসকো অ্যাকাউন্টিং স্ক্যান্ডাল এর সাথে জড়িত থাকার জন্য টপ তিনজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফ্রড এর অভিযোগ আনা হয়েছে। ব্রিটেন এর সিরিয়াস ফ্রড অফিস তাদের এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানিয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা হাফ ইয়ার্লি ফাইনানশিয়াল স্ট্যাটমেন্টস-এ ২৬৩ মিলিয়ন পাউন্ড প্রফিট বেশি দেখিয়েছে।

প্রিমেচিউর কমার্শিয়াল ইনকাম রেভিনিউ হিসেবে রেকর্ড করেছে এবং খরচ দেরিতে রেকর্ড করে তারা এই প্রফিট বেশি করে দেখিয়েছে। এটা করেছে ফেব্রুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৪ সময়ের মধ্যে।

টেসকোর এক কর্মকর্তা জেনারেল কাউন্সিলকে বিষয়টা জানায়। তারপর টেসকো ডেলয়েটকে এই ফ্রড ইনভেস্টিগেশনের জন্য নিয়োগ দেয়।

তারা ইনভেস্টিগেট করে ২৬৩ মিলিয়ন পাউন্ড প্রফিট বেশি দেখানো হয়েছে বলে তাদের রিপোর্টে জানায়।

তারপর এই রিপোর্ট সিরিয়াস ফ্রড অফিসকে দেওয়া হয়।

সেই ধারাবাহিকতায়ই তিনজন কর্মকর্তাকে ২২ সেপ্টেমবর আদালতে হাজির হতে বলেছে।

কিছুদিন আগে টেসকো অ্যানুয়াল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে তারা বলেছে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার লিগাল পরিনতি হবে ভয়াবহ।

এখন যে কমার্শিয়াল ইনকাম এবং খরচের কথা বলা হচ্ছে তা করা হয়েছে টেসকোর সাপ্লায়ারদের সাথে।

টেসকো তাদের সুপারস্টোর-এ সেলস এর পাশাপাশি সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে কমার্শিয়াল ইনকাম পেয়ে থাকে।

যেমন, টেসকোর রিটেইল শপ এর শেলফ-এ বিভিন্ন সাপ্লায়ারদের প্রডাকটস ডিসপ্লে করার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফি পেয়ে থাকে।

এই ফি আবার লোকেশন অনুযায়ী ভিন্ন।

প্রাইম লোকেশনে চার্জ বেশি হয়ে থাকে।

সাপ্লায়ার এই ফি দিয়ে থাকে যাতে করে কনজিউমার প্রডাকটস কিনতে এসে চোখ পরে তাদের প্রডাকটস এর উপর। এতে করে কনজিউমাররা বেশি করে তাদের প্রডাকটস কিনবে। তাদের সেলস বেশি হবে।

টেসকো আরেক ধরনের ইনসেন্টিভ পেয়ে থাকে সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে। সেটা হলো রিবেট।

যদি কোন সাপ্লায়ার এর নির্দিষ্ট প্রডাকটস তাদের দেওয়া সেলস টার্গেট অতিক্রম করে তাহলে তার উপর একটি নির্দিষ্ট হারে রিবেট পেয়ে থাকে।

যেমন, কোকা-কোলা ২ লিটার বোতল যদি ২ লাখ সেল করতে পারে তাহলে ২% রিবেট পাবে কিন্তু যদি তা ৪ লাখ সেল করতে পারে তাহলে ৫% রিবেট পাবে।

এই রিবেট শুধু টেসকো না সকল সুপারমার্কেটই পেয়ে থাকে।

এখন সমস্যা হলো যখন তারা হাফ ইয়ার্লি ফাইনানশিয়াল স্ট্যাটমেন্টস তৈরি করে তখন তাদেরকে এস্টিমেট করতে হয় সারা বছরে তাদের এই সেলস টার্গেট কত হবে।

সেই এস্টিমেট ধরে তারা হাফ ইয়ারের জন্য রেভিনিউ ক্যালকুলেশন করে থাকে। টেসকোর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

হাফ ইয়ার্লি ফাইনানশিয়াল স্ট্যাটমেন্টস তৈরি করার আগে টেসকো সেন্ট্রাল ফাইনান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে সকল ইন্ডিভিজুয়াল ম্যানেজারকে মেইল দেওয়া হয় সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে তারা কত রিবেট আশা করছে তা জানানোর জন্য।

এটা সম্পূর্ণ জাজমেন্টাল বিষয় যেটা ম্যানেজাররা স্বাধীনভাবে করে থাকে। এর জন্য তাদেরকে কোন প্রকার এভিডেন্স দেখাতে হয় না।

আর তাই তারা তাদের রিবেট এস্টিমেট করার সময় স্বভাবতই বেশি আশাবাদী থাকে। এই আশাবাদ আরো বড় আকার ধারন করে যদি এর সাথে ম্যানেজারদের কমিশন বা বোনাস জড়িত থাকে।

কিন্তু সমস্যা হলো, কম্পিটিশন বেড়ে যাওয়ার কারনে কিছু সময় ধরে টেসকোর ব্যবসা ভালো যাচ্ছিলো না।

তাদের সেলস প্রতিনিয়তই কমে যাচ্ছিলো।

তাই তারা সাপ্লায়ারদের কাছ থেকেও এই ধরনের অফার কম পেয়ে আসছিলো।

তাই সন্দেহ করা হচ্ছে তারা তাদের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা না করে পাস্ট রেকর্ড ফলো করে এস্টিমেট করেছে। এবং তারা তাদের সেই উচ্চাবিলাসী টার্গেট পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো প্রফিট বেশি করে দেখিয়ে যে ফ্রড হলো এর জন্য দায়ী কে?

ইতোমধ্যেই জানা গেছে কম্পানির টপ এমপ্লয়ী এর সাথে জড়িত। তারপরে প্রশ্ন এসেছে, টেসকো-র অডিটর কি করেছেন?

তারা কেন এই ফ্রড ধরতে পারেন নি?

এর উত্তর হলো, ফ্রড বন্ধ বা বের করা অডিটরের কাজ না।

ফ্রড বন্ধ বা বের করার দায়িত্ব হলো ম্যানেজমেন্টের।

ম্যানেজমেন্ট কম্পানিতে ইন্টারনাল কন্ট্রোল ইমপ্লিমেন্ট করে কম্পানির ফ্রড বন্ধ করবে।

তাহলে এবার প্রশ্ন আসতে পারে অডিটরের কাজ কি?

অডিটরের কাজ হলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস তৈরি করে অডিটরকে দিবে। তারপর অডিট করে অডিটর একটি রিপোর্ট দিবে যেখানে বলা হয় ফাইনানশিয়াল স্ট্যাটমেন্টস ট্রু অ্যান্ড ফেয়ার ভিউ দিচ্ছে কি না।

এই কাজ করতে গিয়ে অডিটর দেখে ফাইনানশিয়াল স্ট্যাটমেন্টস ফ্রড বা এরর এর কারনে মেটেরিয়ালি মিসস্ট্যাট মুক্ত কিনা।

যদি কোন মেটেরিয়াল ফিগার (একটা পারসেন্টেজ যা ইউজারকে ডিসিশন নিতে প্রভাবিত করে) মিসস্ট্যাট থাকে তাহলেই কেবল তা অডিট রিপোর্টে আসে। এর বাইরে তেমন কিছু না।

অডিট শুরু করার আগে প্লানিং স্টেজ-এ এবং অডিট চলার সময়ে যদি ফ্রড এর আলামত পায় তাহলে অডিটর অ্যাডিশনাল কাজ করে তা বের করার চেষ্টা করে থাকে।

এই কাজগুলো অডিটিং স্ট্যান্ডার্ড ফলো করে করা হয়ে থাকে।

এই স্ট্যান্ডার্ড ফলো করে কাজ করলেও অনেক সময় ফ্রড বের নাও হতে পারে।

এবং অডিটের পর যদি ফ্রড বের হয়ও তারপরেও অডিটরকে এর জন্য দোষারোপ করা যাবে না।

কারন স্যাম্পল বেসিসে অডিটের কাজ করা হয়ে থাকে। তাই সেই স্যাম্পলের মধ্যে ফ্রড নাও আসতে পারে।

আরেকটা বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাহলো, ফ্রডের সাথে জড়িত থাকে টপ ম্যানেজমেন্ট।

তারা এমনভাবে সবকিছু তৈরি করে রাখে যাতে করে ফ্রডের আলামত না থাকে।

যেমন, টেসকোতে যে ফ্রড হয়েছে তা সাপ্লায়ারদের সাথে গোপন নেগুশিয়েশনের মাধ্যমে হয়েছে। সবকিছু উভয় দিক থেকে ঠিক রেখেই করা হয়েছে।

তাই এই ধরনের ফ্রড অডিটরের জন্য বের করা অসম্ভব হয়ে উঠে।

তারপরেও প্রশ্ন আসতে পারে, অডিটরের কি কিছুই করার নেই?

বা অডিটরকে কি কোনভাবেই ফ্রড বের করার জন্য দায়ী করা যাবে না?

সাধারন মানুষরা এখনও মনে করে থাকেন ফ্রড বন্ধ বা বের করা অডিটরের দায়িত্ব।

১৯৪০ সালের আগ পর্যন্ত মনে করা হতো অডিটর অ্যারাথমেটিক্যাল অ্যাকুরেসি নিয়ে কাজ করে।

এবং ফ্রড বন্ধ বা বের করাও তাদের কাজ।

চোর-পুলিশ থিওরি তখন থেকেই প্রচলিত হয়ে আসছে।

এরপর কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনও যখন ফ্রড বের হয় তখনও অডিটরের দিকেই সবাই আঙ্গুল তুলেন।

এই এক্সপেকটেশন গ্যাপ এখনও চলছেই।

এর জন্য সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

অডিটরকে দায়ী করার আগে কিছু বিষয় জানতে হবে।

যেমন, অডিটর যথাযথভাবে অডিটিং স্ট্যান্ডার্ডস ফলো করে অডিট করেছিলো কি না?

যদি করে থাকে তাহলে তাকে এর জন্য দায়ী করা যাবে না। আর যদি দেখা যায় সে তা করেনি তাহলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যাবে।

তাই টেসকোর অডিটর পিডাব্লিউসি যারা ৩২ বছর ধরে অডিট করে আসছে তারা এর জন্য দায়ী কিনা তা জানার জন্য ফাইনানশিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ইনভেস্টিগেট শুরু করেছে।

এটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখনও বলা যাচ্ছে না তারা এর জন্য দায়ী কিনা। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

এখন পিডাব্লিউসি যে ৩২ বছর ধরে টেসকোর অ্যাকাউন্টস অডিট করে আসছে যারা বিগ ফোর অডিট ফার্ম এর মধ্যে একটি তারা এ ব্যাপারে কি বলছে?

তাদের বক্তব্য কি?

তাদের বক্তব্যের আগে, টেসকো বলেছে তাদের ফার্স্ট হাফ ইয়ারের অডিট হয় না।

তাহলে কি তারা এর জন্য দায়ী?

যেখানে তারা অডিটই করেনি সেখানে তাদেরকে কি অভিযোগ করা যাবে?

তবে ইয়ার্লি অডিটের ক্ষেত্রে এর কোন প্রভাব ছিলো কিনা তা এখন পর্যন্ত জানা যায় নি।

এদিকে পিডাব্লিউসি এক বিবৃতিতে বলেছে, আমরা আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এবং সর্বোচ্চ প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ডস মেনে কাজ করতে আমরা এখনও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আমরা এফআরসি-কে তাদের তদন্তের ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

তবে যদি শেষ পর্যন্ত প্রমান হয়ই যে, পিডাব্লিউসি-র গাফিলতি ছিলো তাহলে ধারনা করা হচ্ছে এর জন্য তাদেরকে আনলিমিটেড লায়াবিলিটির মুখোমুখি হতে হবে।

এই পর্যন্ত যতগুলো ফ্রড এর অভিযোগ পাওয়া গেছে তা অ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ফ্রড এর সাথে ম্যানেজমেন্ট জড়িত।

এই ফ্রড যতখানি নিজেদের আর্থিক সুবিধার জন্য করা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি ফ্রড করা হয়েছে ফাইনানশিয়াল ইনফর্মেশন মিসস্ট্যাট করার জন্য।

অডিট করে খুব কমই ম্যানেজমেন্ট ফ্রড বের করা গেছে।

তাহলে মনে মনে একটা অসহায়ত্ব আসতে পারে যে, যেই ম্যানেজমেন্টের ফ্রড বন্ধ করার কথা তারা ফ্রডের সাথে জড়িয়ে পরছে।

আর এদিকে অডিটের মাধ্যমে ফ্রড ধরা নাও পরতে পারে।

তাহলে ফ্রড থামানোর উপায় কি?

ফ্রড সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করা যাবে এমন নিশ্চয়তা দেয়া যাবে না।

তবে কমিয়ে আনার জন্য কিছু বিষয় ফলো করা যেতে পারে।

কম্পানিতে সততার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, অ্যাপ্রুপ্রিয়েট ইন্টারনাল কন্ট্রোল মেইন্টেইন করা এবং সময়মত আপডেট করা, এথিকাল বিহ্যাভিয়ার পলিসি তৈরি করা, এমপ্লইয়ী নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ পলিসি ফলো করে নিয়োগ দেওয়া ইত্যাদি।

এগুলো মেইন্টেইন করতে পারলে ফ্রডের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে।

তাহলে টেসকোর মত এত নামকরা কম্পানিতে কি এগুলো নেই?

আছে কিন্তু কখনো যে এর ব্যতিক্রম ঘটবেনা সে কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares