Tax

ট্রান্সফার প্রাইসিং এবং ট্যাক্স ফাকি

January 9, 2018
Transfer Pricing Image

২০১৬-১৭ বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অবৈধ অর্থের লেনদেন।

এনবিআর ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল গঠন করেছে ক্রস বর্ডার টেক্স এড়ানো এবং ফাকি রোধ করার জন্য। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য আরো অনেক সতর্ক হতে হবে।

যথাযথ পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে এনবিআর-এ একটি পৃথক ইউনিট খোলা হবে ট্রান্সফার মিসপ্রাইসিং, বিদেশী নাগরিকদের টেক্স এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ করার জন্য।

কিছুদিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকে রিপোর্ট এসেছে, সরকার মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিগুলোর লেনদেন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শুরু করেছে যাতে করে তারা তাদের রেভিনিউ কম করে দেখাতে না পারে।

এর উদ্দেশ্য হলো, তারা যাতে মিসপ্রাইসিং করে কম টেক্স দিতে না পারে।

টেক্স ফাইল অডিটের জন্য এরই মধ্যে ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল তাদের ফিল্ড অফিস থেকে কম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক লেনদেনের বিবরণী সংগ্রহ করেছে।

টেক্স ফাকি দেওয়ার যতগুলো গুরুতর অভিযোগ আছে তার পক্ষে যুক্তি হলো, বাংলাদেশে কর্পরেট টেক্স রেট খুবই বেশি যার ফলে কম্পানিগুলো ট্রান্সফার মিসপ্রাইসিং করে টেক্স ফাকি দিয়ে থাকে। এটা তারা করে থাকে যে দেশে টেক্সের পরিমান কম সে দেশে প্রফিট শিপ্ট করে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ট্রান্সফার প্রাইসিং সম্পর্কে তার কিছু পদক্ষেপের কথা বললেও টেক্স রেগুলেশন-এ এবার কোন পরিবর্তন আসেনি। আর তিনি যে পৃথক ইউনিট খোলার কথা বলেছিলেন তা লজিস্টিকস এবং ইনফ্রাসট্রাকচার এর অভাবে থেমে আছে।

এখন প্রশ্ন হলো, মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিগুলো কিভাবে ট্রান্সফার মিসপ্রাইসিং করে থাকে? তারা এটা করে থাকে আইনের দূর্বলতার সু্যোগ নিয়ে। ইনকাম টেক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪-এ সম্পূর্ণ একটা অধ্যায় আছে কিভাবে ট্রান্সফার প্রাইসিং নির্ধারন করতে হবে।

ইনকাম টেক্স অর্ডিন্যান্স ১৯৮৪ অনুযায়ী ট্রান্সফার প্রাইস হবে আর্ম’স লেন্থ প্রাইস।

এখন এই আর্ম’স লেন্থ প্রাইস কি এবং কিভাবে নির্ধারন করতে হবে সে ব্যাপারে কয়েকটি মেথড উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে এর মধ্যে থেকে সবচেয়ে এপ্রোপ্রিয়েট মেথড সিলেক্ট করার জন্য।

এখন এই যে সবচেয়ে এপ্রোপ্রিয়েট মেথডের কথা বলা হলো এটা হলো জাজমেন্টাল ইস্যু।

এক্ষেত্রে লেনদেনের প্রকৃতি, নির্ভরযোগ্য তথ্যে প্রাপ্তিসহ আরো কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হবে যার বেশির ভাগই হলো জাজমেন্টাল। আর এই বিষয়গুলো খুবই জটিল।

এবং এই জটিলতার সু্যোগ নিয়েই কম্পানিগুলো টেক্স কম দেয়ার চেষ্টা করে।

ইনকাম টেক্স অর্ডিন্যান্স-এ যে পাচটি মেথড ফলো করে ট্রান্সফার প্রাইসিং নির্ধারন করতে বলা হয়েছে তার যেকোনটি ফলো করেই প্রাইস মেনিপুলেশন করা যায়।

পাচটি মেথডের মধ্যে একটি হলো কস্ট প্লাস মেথড।

এখন বাংলাদেশে একটি সাবসিডিয়ারি কম্পানি প্রডাক্ট ম্যানুফেকচার করে অন্য দেশে আরেকটি সাবসিডিয়ারি কম্পানিকে সেল করে। পেরেন্ট কম্পানি বাংলাদেশের কম্পানির ক্ষেত্রে তার স্বাধীন মত কস্টের সাথে প্রফিট যোগ করতে পারে।

এই রেট হতে পারে ৫% আবার ২% ও হতে পারে। বা তার স্বাধীন মত যেকোন রেট হতে পারে।

এখন বাংলাদেশে যদি টেক্স রেট অন্য দেশের থেকে বেশি হয় তা হলে সে চাইবে যে করেই হোক এখানে খরচ বাড়িয়ে প্রফিট কম করতে। তাহলে তাকে এখানে টেক্স কম দিতে হবে।

আর যে দেশে টেক্সের পরিমান কম সেখানে প্রফিট বেশি করে দেখাতে। এখন বাংলাদেশ যে দেশে কম রেটে সেল করলো সেদেশের কম্পানির বেশি প্রফিট হবে।

তবে এক্ষেত্রে এনবিআর যদি দেখে অন্য দেশে রিসেল প্রাইস অস্বভাবিক তাহলে কম্পানির সাথে নেগুশিয়েশন করতে পারে। সেক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা কাজ হতে পারে।

কিন্তু সব ক্ষেত্রে ইনফর্মেশন যাচাই করা বা কালেক্ট করা এনবিআর-এর পক্ষে সম্ভব হবে না।

কারন, প্রায়ই আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে জনবল অভাবের কারনে তাদের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়ে উঠে না বলে অজুহাত শুনে থাকি। তাই এটাকেও আমরা বাদ দিতে পারিনা।

ধরে নিলাম, এনবিআর এক্ষেত্রে খুবই সফল হলো।

কিন্তু এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে অনেক হাই প্রাইসে সেল করলেই সরকার সেই মূল্য বেধে দিয়ে ট্রান্সফার প্রাইস নির্ধারন করতে পারবে না।

কারন, যেখানে চাহিদা বেশি থাকবে সেখানে মূল্য বেশি থাকবেই।

যেমন, আমরা প্রায়ই শুনে থাকি গ্রাম থেকে খুব কম মূল্যে পন্য কিনে ঢাকায় এনে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতো রিপোর্ট হচ্ছে সরকার কি এখানে দাম বেধে দিয়ে প্রাইস ঠিক করতে পারছে?

আবার যেখানে ইউনিক প্রডাক্ট ম্যানুফেকচার হবে, যা অন্য কোনো কম্পানি আগে তৈরি করেননি বা অন্য কোনো কম্পানিই তৈরি করেন না সেক্ষেত্রে তার প্রাইস কিভাবে নির্ধারন করা হবে?

এখানে এনবিআরকে সম্পূর্ণভাবে কম্পানির উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় নেই।

আবার এমনও হতে পারে, বাংলাদেশ থেকে একটা প্রডাক্টের একটি অংশ তৈরি হয়ে অন্য একটি দেশে যায়। এটি অন্য কম্পানিতে সেল করা যায়না বা সেল করার উপযোগি না। তখন এর প্রাইস কিভাবে নির্ধারন হবে?

এক্ষেত্রে আমরা একটি মোবাইল সেট ম্যানুফেকচারার কম্পানির কথা বলতে পারি।

সেই মোবাইল সেটের জন্য বাংলাদেশ থেকে শুধু সফটওয়্যার ব্যাবহার করা হয়। এই সফটওয়্যার রিসেল হয়না। এবং যেহেতু এটা অন্য একটা প্রডাক্টের সাথে যোগ হয়ে মার্কেটে সেল হয় তাই তার বিক্রয় মূল্য জানাও সম্ভব না।

এখন এনবিআর কি করবে?

তাই কিছু লিমিটেশন থেকেই যায়। আর এর সু্যোগ কম্পানিগুলো নেওয়ার চেষ্ঠা করবে এটাই স্বভাবিক।

আর কম্পানিগুলো এইসব সুবিধাগুলো পাওয়ার জন্য এক্সপার্ট নিয়োগ করে থাকে। কারন এই বিষয়গুলো খুবই জটিল।

তাই সরকারকেও এনবিআর-এ কিছু এক্সপার্ট নিয়োগ করতে হবে যারা বিষয়গুলো বুঝবেন।

বাংলাদেশ সরকারকে ডোনার এজেন্সি লোন দিয়ে সেই প্রজেক্ট-এ এক্সপার্ট নিয়োগ করে থাকে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তারা যেমন কাজ করেন তেমনি চুক্তিভিত্তিক এক্সপার্টও কাজ করে থাকেন।

সরকার এই বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

তবে টেক্স রেট বেশি থাকলেই যে ট্রানফার মিস্প্রাইসিং হতে পারে তা না। ট্রান্সফার মিস্প্রাইসিং হলো মাত্র একটি কারন।

রেমিটেন্স জটিলতার কারনেও ট্রান্সফার মিস্প্রাইসিং হতে পারে।

মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি তার বাংলাদেশে অবস্থিত সাবসিডিয়ারি কম্পানির প্রফিট সে দেশে নিয়ে যেতে যদি অনেক বাধা-নিষেধ থাকে তাহলে ট্রান্সফার মিস্প্রাইসিং করে প্রফিট নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

প্রফিট নিয়ে যাওয়ার বা প্রফিট ম্যানিপুলেশন করার বিভিন্ন দিক থাকে। সেগুলো কাজে লাগিয়ে প্রফিট ম্যানিপুল্যাশন করে।

আরেকটি কাজ করতে পারে, কম্পানিগুলো যাতে ঝামেলাহীনভাবে ব্যবসা করতে পারে, তাদের প্রফিট রেমিট করতে পারে সেই বিষয়গুলো চিন্তা করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের মত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে ট্যাক্সের রেট কেমন সেটাও বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তা না হলে আইনের দূর্বল দিকগুলো ব্যবহার করে তারা তাদের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেই যাবে। শুধুশুধু দোষারুপ করা ছাড়া কোন লাভ হবে না।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares