Money

বিশ্ব কাপ ২০১৮: বিলিয়ন ডলার বিজনেস

June 3, 2018
World Cup Football 2018

বিশ্বের ক্রিড়া জগৎ এর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আসর বসতে যাচ্ছে ১৪ জুন রাশিয়াতে। এই নিয়ে চলছে সারা বিশ্বে উন্মাদনা। ঢাকার রাস্তায় বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন সাইজের পতাকা ফেরি করে বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। প্রিয় দলের পতাকা উড়িয়ে ভরে যাবে ঢাকাসহ সারা দেশের আকাশ। পত্রিকাগুলোতে শুরু হয়ে যাবে প্রতিদিনের খেলার কুইজ এবং জয়ীদের পুরস্কার বিতরণ। বিভিন্ন কোম্পানিও যোগ দিবে এই কুইজে।

এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে এই বিশ্ব কাপকে নিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। এটা এমন একটা ব্যবসা যেখানে একাই নেতৃত্ব দেয় ফুটবল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ফিফা। এখানে তার কোন প্রতিযোগী নেই। তাকে কোন বিনিয়োগও করতে হয়না। তাই ফিফার ব্যবসায়িক ঝুকিও নেই।

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯০৪ সালে ফিফা গঠিত হয়। ২০৯ সদস্য বিশিষ্ট এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট গিয়ানি ইনফানটিনো। এর আগে ছিলেন সেপ ব্লাটার যিনি পাচ বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। ফিফা সুইস আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। জুরিক-এ ২০০৬ সালে তৈরি করা নিজস্ব কমপ্লেক্সে এর প্রধান কর্যালয় অবস্থিত।

চার বছর পর পর বিশ্ব কাপ আয়োজন করে থাকে ফিফা। ফিফার সদস্য দেশগুলোর ভোটাভোটির মাধ্যমে বিশ্ব কাপ আয়োজক দেশ নির্বাচিত হয়। আর স্বাভাবিকভাবেই এই ভোটাভোটি তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়।

আয়োজক দেশের লাভ কি?

যে দেশ বিশ্ব কাপ আয়োজন করে তাদেরকে অবকাঠামো খাতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। তাই সেই দেশের প্রতি বিশ্বের বড় বড় বিনিয়োগকারীদের নজর থাকে। এই বিশাল বিনিয়োগের ফলে দেশের অর্থনীতির অনেক উন্নতি হয়।

বিশ্ব কাপ আয়োজনের জন্য রাশিয়া প্রথমে ২০ বিলিয়ন ডলার বাজেট রাখলেও তা পরে কমিয়ে প্রায় অর্ধেকে নিয়ে আসে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক মন্দার কারনে এই বাজেট কয়েক দফা কমানো হয়। এবং শেষ পর্যন্ত ১১.৮ বিলিয়নে এসে থামে।

খেলা আয়োজনের জন্য যতো খরচ হয় তার সবটাই করে থাকে আয়োজক দেশ। খেলা আয়োজক কমিটিকে খুব কম পরিমানে খরচ দিয়ে থাকে ফিফা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার জন্য প্রায় অর্ধেকই খরচ করা হয়। যেসব শহরে বিশ্ব কাপ খেলা আয়োজিত হবে সেসব বিমানবন্দরগুলোকে সংস্কার এবং আধুনিকায়ন করতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এর বাইরে ট্রাম লাইন, হোটেল এবং ছোট ছোট থাকার স্থাপনাও রয়েছে।

বিশ্ব কাপ শেষ হওয়ার পর ফিফা আয়োজক দেশকে লিগ্যাসি ফান্ড থেকে মোটামোটি একটা বড় অংকের অর্থ দিয়ে থাকে। ২০১৪ বিশ্ব কাপ আয়োজক দেশ ব্রাজিলকে ওয়ার্ল্ড কাপ লিগ্যাসি ফান্ড থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়া হয় তাদের দেশের খেলাধূলায় সহযোগিতা, যুব ও মহিলা ফুটবল, চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য প্রকল্পে কাজে লাগানোর জন্য। তাদের বিশ্ব কাপ আয়োজনে ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিলো।

তখন অপচয়, অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিলো। মিডিয়াতে লেখালেখি হয়েছিলো, ফিফা ব্রাজিল এসেছে টাকা নিয়ে যেতে এবং তারা খেলা শেষ হলেই পালাবে।

তবে ফিফা বলেছে, এর জন্য দায়ী ব্রাজিলিয়ান ফেডারেশন। ফিফা শুধু অনুমোদন দিয়ে থাকে। যে খরচ হয়েছে তা অ্যাকাউন্টিং ফার্ম কেপিএমজি (KPMG) দ্বারা অডিট করানো হবে। উল্লেখ্য, ফিফা ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং এর জন্য আইএফআরএস (IFRS) ফলো করে থাকে।

২০১৪ বিশ্ব কাপ আয়োজন থেকে ফিফা ৪ বিলিয়ন ডালার আয় করেছিলো। এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারই খরচ করা হয়েছিলো নতুন স্টেডিয়াম তৈরি এবং কিছু সংস্কার করতে। আর ২০১৮ বিশ্ব কাপ থেকে ধারনা করা হচ্ছে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় হবে।

আয়ের উৎস কি?

ফিফার আয়ের অংক বিশাল। ফিফা টেলিভিশন রাইটস, মার্কেটিং রাইটস এবং লাইসেন্সিং রাইটস বিক্রি করে প্রচুর অর্থ আয় করে থাকে। ফিফা খেলা প্রচার স্বত্ব কয়েকটি কোম্পানির মাধ্যমে বিক্রি করে যারা আবার বিভিন্ন স্থানীয় প্রচার মাধ্যমগুলোর কাছে বিক্রি করে।

বিপরীতে তাদের খরচের অংক খুবই ছোট। যে সব দেশ বিশ্ব কাপ খেলায় অংশগ্রহণ করে ফিফা তাদেরকে প্রাইজ মানি দেয়া। এর সাথে তাদের খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফ এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের যাতায়াত এবং থাকার খরচও বহন করে।

২০১১-২০১৪ সময়ে ফিফা আয় করে ৫.৭১৮ বিলিয়ন ডলার। ৮৯.৮%-ই হলো ইভেন্ট সম্পর্কিত আয়। ২.৪৮৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয় শুধুমাত্র টেলিভিশন রাইটস বিক্রি থেকে। এর মধ্যে ২.৪২৮ বিলিয়নই আসে ২০১৪ বিশ্ব কাপ থেকে।

এরপর সবচেয়ে বেশি আয় আসে মার্কেটিং রাইটস থেকে ১.৬২৯ বিলিয়ন ডলার এবং ১.৫৮০ বিলিয়ন ডলার শুধু বিশ্ব কাপ থেকে। টিকেট বিক্রি থেকে ৫২৭ মিলিয়ন ডলার।

৯৩.৯% আয়ই আসে ২০১৪ বিশ্ব কাপ থেকে যা ৪.৮২৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫০.৩% টেলিভিশন রাইটস, ৩২.৭% মার্কেটিং রাইটস এবং মাত্র ১০.৯% টিকেট বিক্রি করে।

স্পন্সরশীপ

ফিফা প্রতিনিয়তই তাদের এই আয় ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক কৌশল ঠিক করে থাকে। যেমন তাদের স্পন্সরশীপ মডেল। বর্তমানে তিন ধরনের স্পন্সরশীপ রয়েছে। ফিফা পার্টনার্স, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ পার্টনার্স এবং ন্যাশনাল সাপোর্টার্স।

ফিফা পার্টনার্স এর মাধ্যমে ফিফা ব্রান্ড উন্নয়নে কাজ করে এবং বিভিন্ন ধরনের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি পালন করে থাকে। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ স্পন্সর এর মাধ্যেমে ফিফা ব্রান্ড এবং বিশ্ব কাপ প্রমোশনের কাজ করে। আর ন্যাশনাল সাপোর্টার্সের মাধ্যমে আয়োজক দেশ এবং সে দেশে ফিফার ব্রান্ড প্রমোট কারার জন্য কাজ করে।

বরাবরের মত দীর্ঘ সময় ধরে থাকা স্পন্সর হিসেবে এবারও থেকে যায় কোকা-কোলা, হুন্দাই-কিয়া মোটরস, ভিসা এবং অ্যাডিডাস। আর এ বিশ্ব কাপে নতুন তিনটি কোম্পানি যোগ হয়। এরা হলো কাতার এয়ারওয়েজ, গ্যাযপ্রম এবং ওয়ান্ডা গ্রুপ।

টিকেট বিক্রি

মাঠে বসে খেলা দেখার আনন্দই আলাদা। প্রিয় দলের জার্সি পড়ে, ব্যানার নিয়ে, বাশিতে ফু দিয়ে চিৎকার করতে পারা এক অন্য রকম আনন্দ। গ্যালারী ভর্তি দর্শক থাকলে খেলোয়াড়রাও উৎসাহ পান।

মাঠে বসে খেলা দেখার জন্য টিকেট নিয়ে তাই আগে থেকেই একটা উত্তেজনা থাকে ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে। এবার জানা যায়, গ্রুপ পর্যায়ে বিদেশি ফ্যানদের জন্য সবচেয়ে কম মূল্যের টিকেটের দাম হলো ১০৫ ডলার যেটা ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্ব কাপের চেয়ে ১৬% বেশি। আর ফাইনাল খেলার ‘ক্যাটেগরি ওয়ান’ টিকেটের দাম পড়বে ১,১০০ ডলার।

টিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পাবেন রাশিয়ার দর্শকরা। তারা ৩৫০,০০০ ‘ক্যাটেগরি ফোর’ টিকেট পাবেন যেটা ডিসকাউন্ট দিয়ে দাড়াবে ২০ ডলার।

ফিফার সেক্রেটারি জেনারেল এক বিবৃতিতে বলেন, সর্বোচ্চ সংখ্যক দর্শক যাতে গ্যালারীতে বসে খেলা উপভোগ করতে পারে সে জন্য টিকেটের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্ঠা করেছেন। এর জন্য তারা বাজার মূল্য যাচাই করেছেন এবং সেই অনুযায়ী টিকেটের মুল্যও ঠিক করা হয়েছে।

আগের মতোই, ফ্যানরা তাদের নিজের দেশের খেলা দেখার জন্য আলাদা করে টিকেট কাটতে পারবেন, নিজের পছন্দ মতো নির্দিষ্ট ভেন্যু বা যে কোন একটি খেলার জন্য টিকিট কাটতে পারবেন।

২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে খবর প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ড এবং তিউনিশিয়ার ম্যাচের টিকেটের মূল্য ১১,২৩৭ পাউন্ডে উঠেছে। এই খবর প্রকাশের পর ফিফা থেকে জানানো হয়, ফিফার যে অনুমোদিত ওয়েবসাইট আছে তার বাইরে থেকে কোন ফ্যান যদি টিকিট কিনে তাহলে তারা খেলা দেখার জন্য মাঠে প্রবেশ করার অনুমতি পাবে না।

আরেক খবর থেকে জানা যায়, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় রাউন্ডের টিকেট আবেদনের দিক দিয়ে ১৫-তম স্থানে রয়েছে। ফিফাতে মোট চার মিলিয়ন টিকেটের জন্য আবেদন পড়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড থেকে আবেদন পড়েছে ২৬,৬৭০টি। আয়োজক দেশ হিসেবে রাশিয়া ৫৫% টিকেট পাবে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরর প্রথম দিকে টিকেটের জন্য আবেদন শুরু হয়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারীর শেষ পর্যন্ত চলেছে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি আবেদনকারীরা তাদের ফলাফল জানতে পারেন।

দ্বিতীয় বার আবার এপ্রিল মাসে আবেদন নেয়া শুরু হয়। এবার ৪,০২১,২১১টি টিকেটের জন্য আবেদন পরে।

মোট খেলা হবে ৬৪টি। ১১টি সিটিতে ১২টি লোকেশনে এই খেলা চলবে। এই খেলাগুলোতে মোট ২.৫ মিলিয়ন বিক্রি করবে ফিফা।

প্রথম রাউন্ডে ফিফা ৭৪২,৭৬০টি টিকেট বিক্রি করে।

খরচ কোথায় হয়?

ফিফা উপরে বর্ণিত খাতগুলো থেকে আয় করতে গিয়ে ২০১১-২০১৪ সময়ে মোট খরচ করেছে ৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে অর্ধেকের থেকে কিছু বেশি ২.৮১৭ বিলিয়ন ডলার (৫২.৩%) খরচ করেছে ইভেন্ট সম্পর্কিত। প্রকল্প উন্নয়ন খাতে ১.০৫২ বিলিয়ন ডলার (১৯.৬%) এবং পরিচালনা ব্যয় ৮৬১ মিলিয়ন ডলার (১৬%)।

ইভেন্ট এর জন্য যে খরচগুলো হয়েছে তার মধ্যে ২.২২৪ বিলয়ন ডলারই খরচ হয়েছে ২০১৪ বিশ্ব কাপে। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় আয়োজক কমিটিকে ৪৫৩ মিলিয়ন ডলার, টিভি প্রডাকশন ৩৭০ মিলিয়ন ডলার, প্রাইজ মানি হিসেবে জয়ী দলকে ৩৫৮ মিলিয়ন ডলার এবং রানার্স-আপ দলকে ৩৫ মিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে।

অন্যান্য উল্লেখ করার মতো খরচ হলো টিকেটিং, আইটি সল্যুশন এবং হসপিটালিটি খাতে ১৫৭ মিলিয়ন ডলার এবং ব্রাজিলকে লিগেসি ফান্ডে ১০০ মিলিয়ন ডলার।

২০১১-২০১৪ সময়ে তাদের আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে ৩৩৮ মিলিয়ন ডলার মুনাফা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে ফিফা খুবই লাভজনক প্রতিষ্ঠান।

এখন পর্যন্ত তাদের রিজার্ভ অর্থের পরিমান দাড়িয়েছে ১.৫২৩ বিলিয়ন ডলার এবং নগদ অর্থের পরিমান ১.০৩৮ বিলিয়ন ডলার।

ট্রফির মূল্য কতো?

বিশ্ব কাপ খেলার মূল আকর্ষণ ট্রফি। সবাই এই ট্রফির জন্য মাঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েন। ফুটবল ফ্যানরা এই ট্রফিটি তাদের প্রিয় দলের হাতে দেখতে চান। ট্রফির প্রতি আকর্ষণ যে বেশি তা খেলার ফাকে ফাকে টিভি ক্যামেরার চোখ ধরার ফলেই আমরা বুঝতে পারি। এবং আমরা চোখ বড় বড় করে ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকি।

১৮ ক্যারেটের সোনা দিয়ে তৈরি বর্তমান ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ সেমি। ১৯৭১ সালে এই ট্রফি ডিজাইন করেছেন ইটালিয়ান ভাস্কর সিলভিও গাযানিগা। তখন ট্রফিটি তৈরিতে খরচ পড়েছিলো ৫০ হাজার ডলার। এখন এর বাজার মূল্য ১০ মিলিয়ন ডলার।

ক্যাশ ফর গোল্ড (সরাসরি সাধারন মানুষদের কাছ থেকে বিশ্বের এক নম্বর সোনা ক্রেতা) বলেছে, ২০০৬ সালে জার্মানিতে বিশ্ব কাপের পর সোনার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে শুধু ট্রফিতে যে সোনা ব্যবহার হয়েছে তার মূল্য ৯৬,৪৭৬ ডলার থেকে বেড়ে ১৮৭,৭৬১ ডলার হয়েছে। এই মূল্য ট্রফির কারুকাজ, ডিজাইন, ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনা করা হয়নি।

তবে ফুটবল ফ্যান বা দলের কাছে ট্রফির আর্থিক মূল্যর চেয়ে এটা অর্জন করা অনেক সম্মানের। এর ডিজাইনার গাযানিগা বলেন, খুব সাধারনভাবে বলতে গেলে এর সাথে জড়িয়ে আছে গভীর আবেগ। আসলে এর উদ্দেশ্য কি? এই ট্রফি কি বুঝায়? এটা জয়ের প্রতীক। এর জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। আর এ জন্যই তারা এটি পেয়ে কিস করে, যেমন করে থাকে ধর্মীয় কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে।

আমরা যে ট্রফি দেখে থাকি তা জয়ী দল কিছুদিনের জন্য পেয়ে আবার ফিফাকে ফেরত দিয়ে দিতে হয়। তারা ফিফার কাছ থেকে একটি রেপ্লিকা পায়।

১৯৩০ সালে বিশ্ব কাপ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত দুইটি ট্রফি ব্যবহার করা হয়েছে। জুলে রিমে ট্রফি ১৯৩০ থেকে ১৯৭০। আর ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি ১৯৭৪ থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে।

১৯৪৬ সালের আগ পর্যন্ত জুলে রিমে ট্রফির আসল নাম ছিলো ‘ভিক্টরি’। সোনা দিয়ে তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ছিলো ৩৫ সেমি এবং ওজন ছিলো ৩.৮ কেজি। জুলে রিমে ছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট। তিনিই ১৯২৯ সালে ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাকে সম্মান জানানোর জন্যই ১৯৪৬ সালে ভিক্টরি ট্রফির নামকরন করা হয় তারই নামে অর্থাৎ জুলে রিমে।

এরপরেই ফুটবল ইতিহাসে ১৯৫৮ ঘটে যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘঠনা। সে বছর বিশ্ব কাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সুইডেনে। বিশ্ব কাপ জিতে ছিলো ব্রাজিল। ট্রফি শোভা পাচ্ছিলো ব্রাজিলিয়ান ক্যাপ্টেন হিল্ডেরাল্ডো বেলিনি-র হাতে। এমন সময় তিনি শুনতে পান ফটোগ্রাফাররা তাকে অনুরূধ করছেন ট্রফিটা আরো ভালোভাবে ধরার জন্য যাতে করে তারা একটি ভালো ছবি নিতে পারেন। তখন তিনি হাতে থাকা ট্রফিটি মাথার উপর তুলে ধরেন। সেখান থেকেই এখন পর্যন্ত এটাই হয়ে গেছে রীতি। সব ক্যাপ্টেন এখন মাথার উপর ট্রফি তুলে ধরেন।

এই ট্রফির উপর কোটি কোটি মানুষের চোখ। কিন্তু কিছু মানুষের এর উপর খারাপ নজর থাকবেই। তারা চাইবেন অবৈধভাবে এটা তাদের কাছে রাখতে। ঠিক এমনটাই করার চেষ্টা হয়েছিলো ১৯৬৬ সালে। ইংল্যান্ডে বিশ্ব কাপ আয়োজনের চার মাস আগে ২০ মার্চ ওয়েস্টমিনস্টর সেন্ট্রাল হলে বিশ্ব কাপ প্রদর্শিত হচ্ছিলো। সেখান থেকে ট্রফি চুরি হয়ে যায়! এর ঠিক সাত দিন পর সাউথ লন্ডনে পিকলস নামের একটি কুকুর নিউজপেপারে মোড়ানো অবস্থায় ট্রফির সন্ধান পায়।

এরপর নিরাপত্তার কারনে ট্রফির রেপ্লিকা বানানো হয় যা ১৯৭০ সালের বিশ্ব কাপের আগ পর্যন্ত প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু এটা বরাবরই ফিফা অস্বীকার করে এসেছে। পরে ১৯৯৭ সালে সেই রেপ্লিকা ২৫৪,৫০০ ডলারে নিলামে বিক্রি হয়।

১৯৭০ সাল। এবার আর চুরি নয়। ব্রাজিল ১৯৭০ বিশ্ব কাপ জয়ের মাধ্যে মোট তিনবার বিশ্ব কাপ জিতার গৌরব অর্জন করে। এবং এর ফলে ব্রাজিল আজীবনের জন্য আসল ট্রফির মালিক হয়ে যায়। ব্রাজিল এই ট্রফি তাদের ফুটবল কনফেডারেশন প্রধান অফিস রিও ডি জেনিরোও-তে বুলেট প্রুফ গ্লাসের ভিতরে রাখে।

সেখান থেকে ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে জুলে রিমে ট্রফি আবার চুরি হয়ে যায়। পরে তা আর খুজে পাওয়া যায়নি। ধারনা করা হচ্ছে, এই ট্রফিতে যে সোনা ছিলো তা গলিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

ব্রাজিল জুলে রিমে ট্রফির মালিক হয়ে যাওয়ার পর ফিফা ১৯৭৪ বিশ্ব কাপের জন্য নতুন ট্রফির উদ্যোগ নেয়। সাতটি দেশ থেকে মোট ৫৩টি ডিজাইন সাবমিট করেন ভাস্কররা। এর মধ্য থেকে ইটালিয়ান ভাস্কর সিলভিও গাযানিগার ডিজাইন নির্বাচিত হয়।

১৮ ক্যারেটের ৫ কেজি সোনা দিয়ে তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৫ সেমি। এই ট্রফিও জয়ী দলকে দেওয়া হয় না। ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা দেওয়া হয় যেটার উপর সোনা দিয়ে মোড়ানো থাকে।

২০১৪ বিশ্ব কাপ জেতার ফলে জার্মানী এই ট্রফি তিনবার জেতার গৌরব অর্জন করে।

২০১৪ বিশ্ব কাপ আয়োজনের পর এবার ২০১৮-তে রাশিয়াতে বিশ্ব কাপ আয়োজিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু রাশিয়াকে আয়োজক দেশ নির্বাচন নিয়ে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছিলো।

আয়োজক দেশ নির্বাচনে দূর্নীতির অভিযোগ

ফিফার বিরুদ্ধে ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্ব কাপ আয়োজক দেশ নির্বাচনে অব্যবস্থাপনা এবং দূর্নীতির অভিযোগ উঠে। ফিফা প্রেসিডেন্টসহ কয়েকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের নামও এই অভিযোগের মধ্যে উঠে আসে। ৩ জুন ২০১৫-তে এফবিআই জানায়, এই অভিযোগ তারাও তদন্ত করছে। এবং এর জের ধরে মে ২০১৫-তে ফিফা প্রধান অফিস থেকে ফিফার সাত উর্দ্ধতন কর্মকর্তাকে ইউএস আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রেফতার করে।

আয়োজক দেশ নির্বাচনে দূর্নীতির অভিযোগ উঠার পর ইংল্যান্ড বিশ্ব কাপ খেলা বয়কটের হুমকি দেয়। ফিফা ভাইস-প্রেসিডেন্ট এর সাথে ডেবিড ক্যামেরন যখন দেখা করেন তখন ভোট বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিলো।

শুধু তাই না, ২০১৫ সালে ফিফা টপ লেবেলে দূর্নীতির সন্দেহ যখন প্রকাশিত হয় তখন কন্টিনেন্টাল, জনসন অ্যান্ড জনসন এবং ক্যাস্ট্রল জানিয়ে দেয় তারা আর ফিফার সাথে স্পন্সর হিসেবে থাকছে না। এই অভিযোগের পর ফিফার স্পন্সর পেতে অসুবিধা হয়। বিশ্ব কাপ শুরু হওয়ার মাত্র দুই মাস আগেও খবর প্রকাশিত হয় ফিফা তাদের স্পন্সর পেতে সমস্যার মধ্যে আছে। জানা যায়, ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্ব কাপে দুই মাস আগে যে সংখ্যক স্পন্সর পেয়েছিলো তার তুলনায় ২০১৮ রাশিয়া বিশ্ব কাপে স্পন্সরের সাড়া কম পাচ্ছে।

এই অভিযোগের পর ফুটবল এসোসিয়েশন তদন্ত করে যদিও সেই রিপোর্ট পরে প্রকাশিত হয়নি। শুধু ৪২ পাতার সারাংশ প্রকাশিত হয় যেখানে কিছু ফাইন্ডিংস উল্লেখ থাকে। তবে ফুটবল এসোসিয়েশন এর অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স কমিটি জানায়, নির্বাচন পদ্ধতিতে যে ভোট কেনা হয়েছে তার প্রমান থাকতে হবে এবং তাহলেই কেবল আয়োজক দেশ বাতিল করা যাবে।

১১০ বছরের ফিফার ইতিহাসে মাত্র আট জন ফিফার প্রেসিডেন্টের দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। যা নিয়ে স্বচ্ছতা এবং সুশানের অভাবের অভিযোগ উঠে।

দেশের বাইরে রাশিয়ার নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ উঠলেও নিজের দেশেও সমালোচনার মুখে পড়ে আয়োজক কমিটি। বিশ্ব কাপ ২০১৮ আয়োজনের জন্য যে মহাযজ্ঞ চলছিলো সেখানে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নির্মান শ্রমিকদের সাথে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে। অভিযোগের মধ্যে ছিলো মজুরি পরিশোধ না করা, তিন-চার মাস বিলম্বে মজুরি পরিশোধ করা, তীব্র শীতের মধ্যে জোরপূর্বক কাজ করানো ইত্যাদি।

বাজি নিয়ে উন্মাদনা

যাই হোক, কয়েকদিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব কাপ ফুটবল ২০১৮। খেলার মাঠে, গ্যালারীতে, টিভির সামনে চলবে উত্তেজনা। আর এই সাথে পাল্লা দিয়ে চলবে ফুটবল খেলা নিয়ে বাজি উন্মাদনা। প্রতিটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়বে বাজির মধ্যে। কে কতো টাকা পেলেন আর কে কতো টাকা খোয়ালেন তা প্রতিটা খেলা শেষে পাড়া-মহল্লায় নিয়ে চলবে আলোচনা।

পাড়া-মহল্লায় টিভির সামনে চলে বাজি। আবার আগে থেকেও এই বাজি ধরাধরি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এখন অনলাইনের যুগে বাজি ধরার জন্য তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস এবং ওয়েবসাইট। তাই যে কেউ যে কোন স্থান থেকে বাজিতে অংশ নিতে পারবেন।

অনলাইন ভিত্তিক অ্যাপস বা ওয়েবসাইট হওয়াতে লাইভ বাজি ধরা যাবে। অর্থাৎ খেলা চলাকালীন বাজিতে অংশ নেয়া যাবে। যেমন, কোন প্লেয়ার গোল করবে, কয়টা কর্নার হবে, পেনাল্টি হবে কিনা, হলুদ কার্ড কয়টা দেখানো হবে, লাল কার্ড দেখানো হবে কিনা ইত্যাদি। এই ধরনের প্রায় একই খেলাতে দুইশোর উপরে বাজি হতে পারে।

তবে এই বাজি ধরা নিয়ে অনাকাংক্ষিত ঘটনার খবর প্রায়ই মিডিয়াতে পেয়ে থাকি। অনেক সময় মারামারি বা হত্যার মতো ভয়ানক ঘটনাও শুনা যায়।

তবে এটা শুনা যায় এই বাজি নিয়ে অনেক টাকা লেনদেন হয়। সঠিক কোন সংখ্যা জানা না গেলেও এটা অনুমান করা যায়, টাকার অংকটা বিশাল।

সব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ১৪ জুন বিশ্ব কাপ ২০১৮-র পর্দা উঠতে যাচ্ছে। একে নিয়ে যে বিলিয়ন বিলয়ন ডলারের বিজনেস হয় তা জানলাম।

বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই বিশ্ব কাপ থেকে কতো বিজনেস হবে? ২০১৪ সালে কতো বিজনেস হয়েছিলো?

সংখ্যায় এটা না জানলেও, এটা জানি বিশ্ব কাপ নিয়ে প্রতিদিন পাড়া-মহল্লায় একটা উৎসব উৎসব আমেজ থাকে। আর একে ঘিরেই থাকে বিজনেস।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

shares