Money

বেশি সেলফি, বেশি প্রফিট, অসীম লস এবং মানসিক ব্যাধি

January 9, 2018
Selfie Business

১৯ আগস্ট ২০১৬ বিবিসি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যাতে বলা হয় সেলফির কারনে মেক-আপ আইটেম বিক্রির পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অনেকে এটাকে চরম মাত্রায় নার্সিসিজম বলছেন।

আবার অনেকের কাছেই এটা কেবলমাত্র ফান।

কসমেটিকস বিক্রেতা কম্পানি এস্টী লাউডারের মতে, এখন সেলফি হলো একটা ট্রেন্ড যার ফলে মেক-আপ বিক্রির পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে।

তাদের গত জুনের হিসেব মতে কসমেটিকস বিক্রির পরিমান অন্যান্য প্রডাক্টের তুলনায় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কসমেটিকস বিক্রেতা কম্পানি স্বীকার করছে কসমেটিকস আইটেম তাদের ক্রেতাদের কাছে পছন্দের তালিকায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর কারন হলো, মানুষ সব সময় এমনভাবে থাকতে চান যাতে করে যেকোন সময় ক্যামেরা দিয়ে তাদের সেলফি তুলতে সুবিধা হয়।

আর এর কারনে তাদের বিক্রি ৪% বেড়ে যায় যার টাকায় পরিমান হলো ১১.২ বিলিয়ন ডলার।

তাদের কসমেটিকস আইটেমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা হলো লিপস্টিক এবং ফাউন্ডেশন-এর।

এখন ইংল্যান্ডে তাদের সেলস বৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে আছে।

এস্টী লাউডারের মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, এখন সবাই তাদের ছবি তুলতে আগ্রহি এবং তারা যেই মুডে ছবি তুলতে চান মেক-আপ তাদেরকে সেই মুড পেতে সাহায্য করে থাকে।

এস্টী লাউডারের মুখপাত্র আরো বলেন, এখন অনেক কিছু পাল্টে গেছে।

এখন আর কেউ সুপারস্টোরে গিয়ে বিউটি এক্সপার্টদের কাছ থেকে পরামর্শ নেন না।

এখন সবাই অনলাইনে ভিডিও দেখে জেনে নেন তিনি কিভাবে নিজেকে সাজিয়ে তুলবেন। যেটা দেখে অন্যরা প্রশংসা করবেন।

আর তাই তারা ইউটিউবে খুবই জনপ্রিয় ভিডিও ব্লগার লিলি সিং এর সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে।

লিলি সিং ইউটিউবে খুবই জনপ্রিয়। বর্তমানে ইউটিউবে তার সাবস্ক্রাইবার ৯.৮৫ মিলিয়ন এর উপরে।

প্রতি সপ্তাহে দুইবার করে তার ভিডিও আসে ইউটিউবে।

গত বছর তিনি ইউটিউব থেকে ৩ মিলিয়ন ডলার আয় করেছেন।

ইউটিউবে মেক-আপ ভিডিওগুলো দেখলে সত্যিই বুঝা যায় নিজেকে অল্প সময়ের মধ্যে কত পরিবর্তন করে ফেলা যায়। কতোটা আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তুলা যায়। আর তাই অনলাইন বিউটি পরামর্শ তাদের কাছে এতোটা জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

স্যামসাংয়ের একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি মানুষের তোলা ছবির ৩০ শতাংশই সেলফি।

স্মার্টফোনের কল্যাণে এবং বিশেষত ফেসবুকের কারনে এর জনপ্রিয়তা সমগ্র বিশ্বেই এখন তুঙ্গে।

নিজের প্রতিকৃতির ইংরেজি সেলফি।

অক্সফোর্ড অভিধানটির সম্পাদকদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও নিজের ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহৃত হয় তা থেকেই ‘সেলফি’ শব্দটির উত্পত্তি।

অক্সফোর্ড অভিধানে ‘সেলফি’ অর্থ হলো এমন, একটি ছবি যা নিজেরই তোলা নিজের প্রতিকৃতি, সাধারণত স্মার্টফোন বা ওয়েবক্যামে ধারণ করা এবং তা সোস্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করা।

সেলফি শব্দটি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে, ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির অনলাইন ভার্সনে শব্দটি সংযোজিত হয়।

২০১২ সালের শেষদিকে টাইম ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে শব্দটি বছরের আলোচিত সেরা ১০ শব্দের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

কেন সবাই এতো সেলফি তুলছেন?

প্রথম কারণ হলো নিজেকে ভালোবাসা। নিজেকে ভালোবেসে অন্যকে দেখাতে চান।

কিন্তু এর সাথে নার্সিসিজম এর সম্পর্ক কি?

এডিথ হ্যামিল্টনের ‘মিথলজি’ বইয়ে ‘নার্সিসাস’ নামে এক যুবকের গল্প আছে।

তাকে অনেক মেয়েই পছন্দ করতো। কিন্তু সে কাউকেই পাত্তা দিতো না।

এই নিয়ে মেয়েদের মধ্যে ক্ষোভ ছিলো।

একদিন এক মেয়ে নার্সিসাসের শাস্তি চেয়ে ইশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। উত্তরে ইশ্বর বললেন, হয়তো নার্সিসাস অন্যকে নয় শুধুমাত্র নিজেকেই ভালোবাসে।

একদিন নার্সিসাস পরিষ্কার পানির উপর তাকায় এবং তার নিজের চেহারা দেখতে পায়। এবং সাথে সাথে সে নিজের প্রেমে পড়ে যায়।

নার্সিসাস বুঝতে পারে অন্যরা তার কাছ থেকে কত যন্ত্রণা পেয়েছে। কারণ সে নিজেরই প্রেমে পড়ে যন্ত্রণা পাচ্ছে।

তার চিন্তা হলো সে কিভাবে সেই পানির উপর দেখা নিজের চেহারার সুন্দরের কাছে পৌঁছাতে পারে?

সেই পানির ওপর দিনের পর দিন অপলক তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে রোগা হতে থাকে এবং একদিন তার মৃত্যু হয়।

কিন্তু অনেক পরে পানিতে বা আয়নাতে নয় স্মার্টফোনে নিজের ছবি তুলে তা নিজে দেখার জন্য এবং অন্যকে দেখানোর জন্য মুখের বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, নানা ঢঙে বিপদজনক স্থানে সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার মুখে পরছেন।

এতে করে প্রায়ই মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়।

যেমন, ইনডিয়ার তেলেঙ্গানা রাজ্যে সেলফি তোলার সময় দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়ে যাওয়া এক বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়ে অপর পাচ বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে।

ভাগদেবী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছয় শিক্ষার্থী ধর্মসাগর হ্রদে বেড়াতে যায়। তাদের মধ্যে একজন সেলফি তোলার সময় হঠাৎ পানিতে পড়ে যায়।

তাকে বাচাতে অন্য পাচ বন্ধুও একে একে হ্রদের পানিতে ঝাপ দেয়।

দুখজনক হলো, যিনি পড়ে যান তিনি বেচে গেলেও তার পাচ বন্ধু পানিতে ডুবে মারা যান।

তাদের সবার বয়স ১৮ বছরের আশপাশে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুইজন মেয়ে এবং অন্য তিনজন ছেলে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশেও হেলিকপ্টার দূর্ঘটনায় মারা যাওয়ার খবর আমরা শুনেছি।

ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান-কে কক্সবাজার নামিয়ে ফেরার পথে এই দূর্ঘটনা ঘটে।

বলা হয়েছে পাইলটের পাশের জানালা খুলে সেলফি তুলতে গেলে ভিতরে বাতাস ঢুকে পরে এবং এক সময় হেলিকপ্টার ক্র্যাশ করে।

এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু শুধু পরিবারকেই ক্ষতিগ্রস্থ করেনা।

তিনি যদি বেচে থাকতেন তাহলে কাজ করতেন। একটি সংসারের যেমন আয় হতো তেমনি দেশের উন্নতিতেও তিনি অবদান রাখতে পারতেন।

তাই বলা যায় এতে করে পারিবারিক আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

পরিবারের কাছে যে ক্ষতি তা পরিমাপ করা যাবে না। তা পরিমাপ করার যোগ্য না।

কিন্তু আর্থিক দিক দিয়ে এর ক্ষতির পরিমান কতটুকু?

ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন যে পদ্ধতি ফলো করে হিসেব করে তাহলো তিনি যদি কোথাও চাকরি করেন তাহলে তিনি কত বেতনে চাকরি করেন, বছরে কত বেতন বাড়তো, আর কত বছর তিনি চাকরি করতে পারতেন এবং দেশের ইনফ্লেশন কত এই সব বিবেচনায় নিয়ে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমান হিসেব করে থাকে।

কিন্তু তিনি বেচে থাকলে দেশের উন্নয়নে কতটুকু আর্থিক অবদান রাখতে পারতেন তা হিসেব করা অসম্ভব।

কিন্তু অনেক ক্ষতি রয়েই যাবে যা কখনো হিসেব করা সম্ভব হবে না।

যাই হোক, এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ছবি পোস্ট করা নিয়ে প্রায়ই নানা সমালোচনা শুনা যায়।

কোন ছবি ফেসবুক বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যাবে, কোনটি করা যাবে না, কোন ছবিটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির সঙ্গে বেমানান, সেসব বিষয় বিবেচনা করাটা জরুরি।

অনেকে প্রিয়জনের সাথে খুব অন্তরঙ্গ ছবি পোস্ট করে থাকেন। কখনো কখনো সেসব ছবি আপত্তিকরও মনে হয়ে থাকে। এই নিয়ে অনেকে বিব্রতও হন।

আবার অন্যের বিরক্তির কারণও হয় যখন অনেকে ঘন ঘন সেলফি পোস্ট করে অন্য বন্ধুদেরকে ট্যাগ করে থাকেন।

আবার এই ছবিগুলো পোস্ট হওয়ার পর লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা কম হলে বিষন্নতায় ভুগেন।

নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন।

এতে করে আরো এগ্রেসিভ হয়ে বেশি করে ছবি পোস্ট করতে থাকেন। এবং মানুষ বিরক্ত হয়ে ইগনোর করতে থাকেন।

আর তখন চরম হতাশায় ডুবে গিয়ে মানসিকভাবে আরো ভেঙ্গে পড়েন। এই জন্যই একে মাসিক ব্যাধির সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে।

এর প্রমান পাওয়া যায় সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

আমেরিকান সাইক্রিয়াটিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) মানসিক ব্যাধির সঙ্গে সেলফি তোলার সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গবেষকেরা দাবি করেছেন, অতিরিক্ত মাত্রায় নিজের ছবি তোলার প্রবণতা এবং সেই ছবি সোস্যাল মিডিয়াতে দেওয়ার এই মানসিক সমস্যার নাম ‘সেলফিটিস’।

গবেষকেরা এই মানসিক সমস্যার আপাতত কোনো সমাধান নেই বলে জানিয়েছেন।

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply

Shares